২৪ দিনে ১৯ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মৃত্যু, আত্মহত্যা ৬

জিটি রিপোর্ট

প্রকাশ:

নিহত শিক্ষার্থীরা
নিহত শিক্ষার্থীরা|ছবি: সংগৃহীত

গত ১০ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিলের মধ্যে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ১৯ জন শিক্ষার্থীর ‘অস্বাভাবিক’ মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ছয়জন আত্মহত্যা করেছেন, নয়জন দুর্ঘটনায় মারা গেছেন এবং বাকি চারজন অসুস্থতার কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন। নিহতদের মধ্যে পাঁচজন মেডিকেল শিক্ষার্থী এবং অন্যরা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটেছে শুক্রবার (৩ এপ্রিল) একদিনেই। এছাড়া পদ্মায় বাসডুবির ঘটনায় একই দিনে চার শিক্ষার্থী প্রাণ হারান।

গত মাসের ১০ মার্চ (মঙ্গলবার) সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রাজশাহীর বেসরকারি ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আনিসা শারমিলা নাফিসা। ৩ মার্চ মেডিকেল কলেজ থেকে বাসায় ফেরার পথে নগরীর লিলি হল সংলগ্ন এলাকায় একটি মিনি ট্রাকের সঙ্গে দুর্ঘটনায় পড়েন তিনি। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল এবং পরে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে নেওয়া হয়, যেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

আরও পড়ুন: ফ্লোরিডায় লক্ষ্মীপুরের নারীকে পিটিয়ে হত্যা

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আইপিই) বিভাগের ২১তম ব্যাচের মেধাবী শিক্ষার্থী আসিফ আসমাত নিবিড় গত মাসের ১৩ মার্চ (শুক্রবার) মারা যান। দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই শেষে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। তার গ্রামের বাড়ি চুয়াডাঙ্গায়। ভিক্টোরিয়া জুবিলি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজে পড়াশোনা শেষে প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি বুয়েটে ভর্তি হয়েছিলেন।

গত ১৬ মার্চ (সোমবার) সকালে ময়মনসিংহ নগরীর কেওয়াটখালি এলাকায় বাসার ছাদ থেকে পড়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা রিজুর মৃত্যু হয়।

একই দিনে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) শিক্ষার্থী দীপা দাস দাম্পত্য কলহের জেরে আত্মহত্যা করেন। জানা যায়, আগের দিন বিকেলে স্বামীর সঙ্গে পারিবারিক বিষয় নিয়ে তার বাগবিতণ্ডা হয়। পরে স্বামীকে একটি ঘরে আটকে রেখে পাশের ঘরে গিয়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দেন তিনি।

সাতক্ষীরা শহরের কাটিয়া এলাকার কর্মকারপাড়ায় গত ১৮ মার্চ সজীব দত্ত (২৭) নামে এক যুবক গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন বলে জানা গেছে। সদর থানার এসআই মহাসিন আলী জানান, পরিবারের দাবি অনুযায়ী সজীব শৈশব থেকেই নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। সকালে ঘরের ভেতরে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তাকে পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন: জাতীয় স্মৃতিসৌধে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান, নারীসহ আটক ৩

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান ইমন গত ২২ মার্চ (রবিবার) সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। সেদিন সন্ধ্যায় গাজীপুরের কালীগঞ্জ এলাকায় যাওয়ার পথে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। তিনি ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২৩২ ব্যাচের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

গত ২৫ মার্চ পদ্মায় বাসডুবির ঘটনায় একই দিনে চার শিক্ষার্থী মারা যান। তাদের মধ্যে ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী আহনাফ তাহমিদ খান রাইয়ান, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জোহরা অন্তি এবং সিআরপির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিএইচপিআইয়ের অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আয়েশা আক্তার সোমা।

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) তড়িৎ ও প্রকৌশল বিভাগের ২৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী আব্দুর রহিম খায়রুল গত ২৭ মার্চ (শুক্রবার) আকস্মিকভাবে মারা যান। তার বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার চায়না বাজার এলাকায়। তিনি রংপুরের কাউনিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০২৩ সালে এইচএসসি পাস করে পরে হাবিপ্রবির তড়িৎ ও প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হন।

রাজধানীর ভাটারার একটি বাড়ির ষষ্ঠ তলার ফ্ল্যাট থেকে গত ২৯ মার্চ (রবিবার) আনিপা নিন্দিয়া (২৫) নামের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি লালমাটিয়া মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর থানার একলাসপুর গ্রামে।

গত ৩০ মার্চ (সোমবার) প্রাইভেটকারের ধাক্কায় নিহত হন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) আইন ডিসিপ্লিনের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মৌমিতা হালদার। খুলনা মহানগরীর জেলা পরিষদ ভবনের সামনে এই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। তিনি নগরীর মুন্সিপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং তার গ্রামের বাড়ি পাটকেলঘাটায়।

রাজধানীর হাজারীবাগের মনেস্বর রোডের ভাড়া বাসায় গত বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী সীমান্ত বিষাক্ত দ্রব্য পান করে আত্মহত্যা করেন।

শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ইংরেজি বিভাগের ৪৪তম আবর্তনের সাবেক শিক্ষার্থী সাবিত মাহমুদ শাওনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তুরাগ থানার ডিউটিরত কর্মকর্তা এসআই ইখলাস মিয়া জানান, প্রাথমিক আলামতের ভিত্তিতে এটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একই দিনে শিক্ষকের রোষানলে পড়ে একটি বিষয়ে পাঁচবার ফেল করায় অভিমানে ১০৯টি ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করেন কুমিল্লার বেসরকারি সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী অর্পিতা নওশিন।

আরও পড়ুন: ‘প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা’ পরিচয়ে প্রতারণা, আটক ১

অন্যদিকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ আহমেদ নাফিজ শুক্রবার সকাল ১০টায় গৌরনদীতে নিজ বাড়িতে মারা যান। ১৬ মার্চ অসুস্থ হয়ে তাকে ঢাকা নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। কিছুটা সুস্থ হওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শে ১ এপ্রিল তাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়।

শুক্রবার রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের (এসএইচএসএমসি) পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া সাবরী মাহি (২৩) ডায়রিয়াজনিত জটিলতায় মারা যান। সহপাঠীরা জানান, তিনি এসএইচএসএমসির ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং শান্ত, ভদ্র ও ভালো মনের একজন মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

সর্বশেষ আজ শনিবার (৪ এপ্রিল) কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে অটোচালক বাবার কাছে টাকা না পেয়ে অভিমানে আজিমুল ইসলাম (২৪) নামের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তিনি উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের শিমুলবাড়ী গ্রামের ফজলুল হকের ছেলে এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।

এসব অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় সহপাঠীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্মৃতিচারণ করে গভীর শোক প্রকাশ করছেন। কারও কাছে তারা ছিলেন প্রিয় বন্ধু, কারও কাছে সহযোদ্ধা বা স্বপ্নের সঙ্গী—হঠাৎ তাদের অনুপস্থিতি সৃষ্টি করেছে এক অপূরণীয় শূন্যতা।

মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!