ঋতু পরিবর্তনের সময় বিষণ্ণতা বেড়ে যায়?

ড

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ:

আবহাওয়া আমাদের অনুভূতিতে প্রভাব ফেলতে পারে
আবহাওয়া আমাদের অনুভূতিতে প্রভাব ফেলতে পারে|ছবি: জিটি ফটো/এআই

দিনের দৈর্ঘ্য কমে যাওয়া, আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং বাইরে কম সময় কাটানোর মতো বিষয়গুলো আমাদের অনুভূতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। কেউ কেউ লক্ষ্য করেন, বছরের নির্দিষ্ট সময়ে তারা কম উদ্যমী, বেশি ঘুমকাতুরে বা আরও অন্তর্মুখী হয়ে পড়েন। মেজাজের মাঝে মাঝে পরিবর্তন স্বাভাবিক হলেও, কোনো নির্দিষ্ট ঋতুর সঙ্গে সম্পর্কিত বিষণ্ণতার পুনরাবৃত্তিমূলক ধরন সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (SAD) নির্দেশ করতে পারে।

SAD হলো এক ধরনের বিষণ্ণতা, যেখানে লক্ষণগুলো একটি নির্দিষ্ট ঋতুতে দেখা দেয় বা আরও খারাপ হয় এবং বছরের অন্য সময়ে উন্নতি লাভ করে। এটি শুধু ঠান্ডা আবহাওয়া বা দিনের দৈর্ঘ্য কমে যাওয়ার কারণে মনমরা বোধ করার চেয়েও বেশি কিছু।

সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার কী?

সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার হলো এক ধরনের বিষণ্ণতা, যা ঋতুভিত্তিক একটি নির্দিষ্ট ধারা অনুসরণ করে। এটি সাধারণত শরৎ বা শীতকালে শুরু হয় এবং বসন্ত বা গ্রীষ্মকালে উন্নতি লাভ করে। তবে কিছু মানুষ বসন্ত বা গ্রীষ্মকালেও এ ধরনের লক্ষণ অনুভব করেন।

আরও পড়ুন: এআই চ্যাটবটকে যেসব বিষয়ে প্রশ্ন করা উচিত নয়

শীতকালীন SAD আংশিকভাবে দিনের আলোর সংস্পর্শে আসার পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। দিনের আলো কমে গেলে তা শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি, ঘুমের ধরণ এবং মেজাজ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত রাসায়নিক পদার্থকে প্রভাবিত করতে পারে।

তবে SAD-এর সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি। জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক ও পরিবেশগত কারণগুলোর সমন্বয় এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

ঋতু পরিবর্তনের সময় মন খারাপ হওয়া কি স্বাভাবিক?

ঋতু পরিবর্তনের সময় মেজাজ, শক্তি বা অনুপ্রেরণায় সাময়িক পরিবর্তন আসতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, দিনের আলো কমে আসা, দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন, প্রচণ্ড গরম বা বাইরের কার্যকলাপ কমে যাওয়ার কারণে ঘুম ও দৈনন্দিন অভ্যাসে প্রভাব পড়তে পারে। এর অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই ব্যক্তির সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (SAD) রয়েছে—এমন নয়।

মূল পার্থক্য হলো এর তীব্রতা, স্থায়িত্ব এবং দৈনন্দিন জীবনের ওপর এর প্রভাব। সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (SAD)-এর ক্ষেত্রে বিষণ্ণতার লক্ষণগুলো প্রতি বছর প্রায় একই সময়ে বারবার দেখা দেয় এবং কাজ, সম্পর্ক, সামাজিক কার্যকলাপ বা দৈনন্দিন জীবনে ব্যাঘাত ঘটায়।

আরও পড়ুন: মিউজকে বিভিন্ন ডিভাইসে ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে মেটা

SAD-এর সাধারণ লক্ষণ

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ (NIMH) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, লক্ষণগুলো ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। তবে শীতকালীন SAD-এর ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে—

- দীর্ঘস্থায়ী মনমরা ভাব;

- কোনো কাজে আগ্রহ বা আনন্দ কমে যাওয়া;

- শক্তি কমে যাওয়া বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি;

- স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘুমানো;

- মনোযোগ দিতে অসুবিধা;

- ক্ষুধার পরিবর্তন;

- বিশেষ করে শর্করা-জাতীয় খাবারের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা;

- সামাজিক বিচ্ছিন্নতা;

- হতাশ, মূল্যহীন বা অসহায় বোধ করা;

- কিছু মানুষের ক্ষেত্রে বিছানা থেকে ওঠা বা স্বাভাবিক রুটিন বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

গ্রীষ্মকালীন SAD-এর ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো ভিন্ন হতে পারে। এর মধ্যে অনিদ্রা, ক্ষুধা কমে যাওয়া, অস্থিরতা, উদ্বেগ এবং খিটখিটে মেজাজ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

দিনের আলো কম থাকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

শীতকালীন SAD-এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো সূর্যালোকের সংস্পর্শ কমে যাওয়া। আলো শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা দেহঘড়ি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, যা ঘুম ও জাগরণ নিয়ন্ত্রণকারী একটি অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা। দিনের আলোর পরিমাণে পরিবর্তন কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই ছন্দকে ব্যাহত করতে পারে।

দিনের আলো কমে গেলে তা ঘুমের সঙ্গে জড়িত হরমোন মেলাটোনিন এবং মেজাজ নিয়ন্ত্রণে জড়িত মস্তিষ্কের রাসায়নিক সেরোটোনিনকেও প্রভাবিত করতে পারে।

এই জৈবিক পরিবর্তনগুলো ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে, কেন কিছু মানুষ নির্দিষ্ট ঋতুতে ঘুম, শক্তি ও মেজাজে পূর্বানুমেয় পরিবর্তন অনুভব করেন। তবে সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (SAD) একটি জটিল অবস্থা এবং শুধু একটি জৈবিক প্রক্রিয়া দিয়ে এটি ব্যাখ্যা করা যায় না।

আরও পড়ুন: এআই নিয়ে ভয় কমাতে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ প্রচারের উদ্যোগ

কাদের SAD হওয়ার সম্ভাবনা বেশি?

SAD যে কাউকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এর ঝুঁকি বেশি থাকে। বিষণ্ণতা বা বাইপোলার ডিসঅর্ডারের ইতিহাস ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যেসব অঞ্চলে দিনের আলোতে বড় ধরনের ঋতুগত পরিবর্তন হয়, সেখানেও SAD বেশি দেখা যায়। পারিবারিক ইতিহাসও এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট ঋতুতে ক্লান্ত বা মনমরা বোধ করার অর্থ এই নয় যে কারও SAD হয়েছে। একজন স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারের মাধ্যমে সামগ্রিক ধরণ ও লক্ষণগুলো মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

কীভাবে SAD নির্ণয় করা হয়?

সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার নিশ্চিত করার জন্য কোনো একক পরীক্ষা নেই। একজন ডাক্তার বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সাধারণত উপসর্গগুলো, সেগুলো কখন দেখা দেয় এবং কোনো নির্দিষ্ট ঋতুভিত্তিক ধারা অনুসরণ করে কি না, সে বিষয়ে জানতে চান। তারা ঘুম, ক্ষুধা, কর্মশক্তি, রোগের ইতিহাস এবং উপসর্গগুলো দৈনন্দিন জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, সে সম্পর্কেও জানতে পারেন।

এ ছাড়া একই ধরনের উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে—এমন অন্যান্য শারীরিক অবস্থাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, থাইরয়েডের সমস্যা, রক্তস্বল্পতা, ঘুমের ব্যাধি, ওষুধের প্রভাব এবং অন্যান্য ধরনের বিষণ্ণতার কারণেও ক্লান্তি বা মন খারাপ হতে পারে।

মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!