ভোরের আলো ফোটার আগেই দিনের শুরু। কখনো রানিং ট্র্যাকে, কখনো সাইকেলের প্যাডেলে, কখনো আবার সুইমিং পুলে। দিনের আরেক অংশ কাটে ব্যাংকের পেশাগত দায়িত্বে। এই দুই জগতের মাঝেই নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন নাহিদ হাসান। রানিং কমিউনিটিতে তিনি বেশি পরিচিত ‘নাহিদ দ্য সুইফট’ নামে। সম্প্রতি তিনি সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন ৫০ কিলিমিটারের আলট্রা রান, যা তাকে বাংলাদেশের পরিচিত আলট্রা রানার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
নাহিদের দৌড়ের যাত্রা শুরু ২০১৯ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের মাঠে। শুরুটা ছিল নিজের ফিটনেস ধরে রাখার জন্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দৌড় তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। করোনা মহামারির সময় যখন অনেকেই ঘরবন্দী, তখন ধানমন্ডি লেকের নির্জন সকালে তিনি চালিয়ে গেছেন অনুশীলন। সেই সময়ই গড়ে ওঠে তার মানসিক দৃঢ়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অভ্যাস। বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে সাব-ইনস্পেক্টর প্রশিক্ষণের সময় দৌড় তার জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে। কঠোর শৃঙ্খলা, নিয়মিত অনুশীলন এবং শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির চর্চা তাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
আরও পড়ুন: সুইডেনে উচ্চশিক্ষা: আবেদন, যোগ্যতা, খরচ ও আবাসন অনুমতির যা জানা দরকার
পরবর্তীতে হাতিরঝিলসহ বিভিন্ন ট্র্যাকে নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করেন বড় বড় প্রতিযোগিতার জন্য। দৌড়ের প্রতি ভালোবাসা তাকে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিয়ে গেছে। থাইল্যান্ড ম্যারাথনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইভেন্টে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। প্রতিবার বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে লাল-সবুজের পতাকা বহন করার অভিজ্ঞতা তার কাছে গর্বের।
নাহিদের অর্জনের তালিকায় রয়েছে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। দৌড়ের পাশাপাশি সাইক্লিং ও সাঁতারেও নিজেকে দক্ষভাবে প্রস্তুত করতে পেরেছেন। বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন স্বীকৃত অ্যাথলেট নাহিদ ২০২৫ সালে নেপাল ইন্টারন্যাশনাল এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। ফিটনেস সংস্কৃতি প্রচার এবং জনস্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরিতে অবদানের জন্য তিনি এই সম্মাননা অর্জন করেন। ২০২৬ সালে রানিং সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য পেয়েছেন গ্লোবাল স্টার অ্যাওয়ার্ড।
আরও পড়ুন: বিশ্বসেরা ৩০ স্কলারশিপের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট
তবে নাহিদের পরিচয় শুধু একজন রানার বা ট্রায়াথলেট হিসেবে নয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্র্যান্ড প্রমোটর হিসেবেও কাজ করছেন তিনি। খেলাধুলা, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং ইতিবাচক জীবনধারার বার্তা ছড়িয়ে দিতে যুক্ত আছেন রানিং ইভেন্ট আয়োজকদের সঙ্গেও। পাশাপাশি জাতীয় পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে তিনি সুস্থ জীবনধারার বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তার বার্তা ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছেছে।
রানিং কমিউনিটির উন্নয়নেও রয়েছে তার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের রানিং ইভেন্ট আয়োজনের স্বপ্ন দেখছেন তিনি। তার বিশ্বাস, পরিকল্পিত আয়োজন এবং পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলাদেশে রানিং ও ট্রায়াথলন সংস্কৃতি আরও শক্ত ভিত্তি পাবে এবং নতুন প্রজন্ম এই খেলাগুলোর প্রতি আগ্রহী হবে।
আরও পড়ুন: আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য সুইডেনের ১০ স্কলারশিপ
বর্তমানে তার লক্ষ্য আইরনম্যান প্রতিযোগিতা এবং আরও বড় আন্তর্জাতিক মঞ্চ। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতা এবং পরিকল্পিত সহায়তা পেলে বাংলাদেশের ট্রায়াথলেটরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও বড় সাফল্য অর্জন করতে পারবেন। নিজেও ভবিষ্যতে আরও আন্তর্জাতিক আয়রনম্যান প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা বিশ্বমঞ্চে আরও উঁচুতে তুলে ধরতে চান।
দেশ-বিদেশ মিলিয়ে ৬০টির বেশি মেডেল থাকলেও এখনো নিজেকে পথের শুরুতেই মনে করেন। তার কাছে দৌড় কোনো শখ নয়; এটি সুস্থতা, আত্মবিশ্বাস এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি আন্দোলন। সেই বিশ্বাস নিয়েই তিনি ছুটে চলেছেন নতুন স্বপ্নের দিকে, আর সঙ্গে বহন করে চলেছেন বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা।

