সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। জুলাই সনদ অনুযায়ী বিরোধী দল ২৬ শতাংশ সভাপতি পদ দাবি করছে। অন্যদিকে সরকারি দল বিষয়টি সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করছে।
জাতীয় সংসদের প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন এবং নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এসব কাজে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা, অনিয়ম ও গুরুতর অভিযোগ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সুপারিশ করতে পারে।
আরও পড়ুন: মাগুরার আলোচিত শিশু আছিয়া হত্যা: হাইকোর্টের রায় আজ
রোববার সংসদে নতুন সংসদীয় কমিটি গঠন নিয়ে বিতর্কের পর নতুন কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি। শুধু চারটি কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। এর পরই প্রশ্ন উঠেছে, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাজ আসলে কী এবং এসব কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে এত আলোচনা কেন?
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাজ কী
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, সংসদীয় কমিটি ব্যবস্থার সাংবিধানিক ভিত্তি রয়েছে। সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, বিশেষ অধিকার কমিটি এবং কার্যপ্রণালি বিধিতে নির্ধারিত অন্যান্য স্থায়ী কমিটির বিধান রয়েছে।
মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির অন্যতম কাজ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা। কোনো অনিয়ম বা গুরুতর অভিযোগ থাকলে কমিটি তা তদন্ত করতে পারে। তদন্তের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ বা সুপারিশও দিতে পারে।
এ ছাড়া সংসদে উত্থাপিত বিল সংশ্লিষ্ট কমিটিতে পাঠানো হলে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মতামত ও সুপারিশ দিতে পারে কমিটি।
আরও পড়ুন: সিএমপির তালিকায় এক নম্বর দুষ্কৃতকারী ‘পিচ্চি জাহেদ’কে কুপিয়ে হত্যা
সরকারি ব্যয় ও জবাবদিহি
সরকারি অর্থের ব্যবহার ও ব্যয়ের ওপর নজরদারিতেও সংসদীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান সংসদে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের এ কমিটির সভাপতি।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন, অভিযোগ কিংবা অনিয়মের বিষয় কমিটির আলোচনায় আসতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়া এবং সুপারিশের মাধ্যমেও নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে এসব কমিটি।
সংসদে কতটি স্থায়ী কমিটি
জাতীয় সংসদে বর্তমানে বিষয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটি রয়েছে ১১টি এবং মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি রয়েছে ৩৯টি। দুই ধরনের কমিটি মিলিয়ে মোট সংখ্যা ৫০টি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এখন পর্যন্ত ১৫টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সরকারি হিসাব সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে।
২৬ শতাংশ সভাপতি পদ কেন চায় বিরোধী দল
জুলাই সনদের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।
পাশাপাশি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচনের প্রস্তাব রয়েছে। বিএনপিসহ ৩০টি দল ও জোট এ প্রস্তাবে একমত হয়েছিল।
আরও পড়ুন: ছয় মাসে দেশে বিচারবহির্ভূত কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটেনি: সংসদীয় কমিটি
সংসদে বিরোধী দলের আসনের অনুপাত প্রায় ২৬ শতাংশ। সে হিসাবে ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির মধ্যে প্রায় ১০টির সভাপতি পদ বিরোধী দলের পাওয়ার কথা। জুলাই সনদে সরাসরি উল্লেখ করা চারটি কমিটি যোগ করলে বিরোধী দলের দাবি অনুযায়ী মোট প্রায় ১৪টি সভাপতি পদ পাওয়ার কথা।
তবে বিদ্যমান সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে সংসদীয় কমিটির সভাপতি কোন দল থেকে দিতে হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা নেই।
সংসদে সরকারি-বিরোধী দলের বিতর্ক
রোববার নতুন সংসদীয় কমিটি গঠনের কার্যসূচির আগে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলকে নাম দিতে আহ্বান জানানো হয়েছিল।
বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, আসনসংখ্যা অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির সদস্য ও অন্যান্য পদ বণ্টনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কোনো কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়নি।
তাহেরের বক্তব্য, একটি কমিটিতে যোগ দেওয়ার সঙ্গে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার বিষয়টি সম্পর্কিত হতে পারে না। তার দাবি, সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদেও বিরোধী দলের ২৬ শতাংশ পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
আরও পড়ুন: ঢাকার যানজট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর সাত নির্দেশনা
অন্যদিকে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে বিরোধী দল থেকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি করার রেওয়াজ নেই। তবে সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ এবার বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে।
সরকারি দল ঐক্যবদ্ধভাবে সংবিধান সংশোধন করতে চায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় অংশ নিলে তাদের দাবি অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
সমঝোতার অপেক্ষায় সংসদ
এ নিয়ে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা শেষে সংবিধান সংশোধনী বিল আনা হবে। সেটি পাস হলে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়িত হবে।
তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটিগুলোতে সংসদের আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দল সভাপতি পদ পাবে। তবে এ জন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে।
আরও পড়ুন: এক্সিকিউটিভ নিয়োগ দেবে অ্যারিসটোফার্মা লিমিটেড, আবেদন ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত
বিরোধী দল বিশেষ কমিটিতে যোগ দিলে একই সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু এবং আসনের অনুপাতে তাদের সভাপতি পদ দিতে সরকারি দল রাজি বলেও জানান তিনি।
তবে বিরোধীদলীয় উপনেতা জানিয়েছেন, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দেওয়া নিয়ে তাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত ভিন্ন। একটি কমিটিতে যোগ দেওয়ানোর জন্য শর্ত আরোপ করা ঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
চলতি সংসদ অধিবেশন ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। এর মধ্যে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা হয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

