কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার দ্রুত বিস্তারের ফলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখোমুখি হচ্ছে। তবে প্রয়োজনীয় নীতিগত প্রস্তুতির অভাবে আগামী দিনে দেশের কর্মসংস্থান, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের লাখো শ্রমিক ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে সতর্ক করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) রাতে সিপিডি আয়োজিত ‘পরিবর্তনশীল কর্মপরিবেশ: বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলে কর্মপরিবেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দূরদৃষ্টি’ শীর্ষক ভার্চুয়াল ওয়েবিনারে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে ‘ভবিষ্যতের কর্মজগতের জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুত? অটোমেশন, এআই ও কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য শ্রমবাজারকে প্রস্তুত করা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিকুল ইসলাম খান।
তিনি বলেন, অটোমেশনের কারণে দেশে তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার চাকরি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি ২০৪১ সালের মধ্যে এ খাতে কর্মরত নারীদের প্রায় ৬০ শতাংশের কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আরও পড়ুন: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে বড় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, পদ ১৬৮, আবেদন ১৭ জুলাই বিকেল ৪টা পর্যন্ত
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোর পরিবর্তন দেশের শ্রমবাজারে নতুন চাপ তৈরি করছে।
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে প্রায় ১৩ লাখ চাকরি কমেছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই নারী কর্মীদের। অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে এআই ও অটোমেশন এক কোটি ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেও প্রায় ৯০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত হবে। ফলে ভবিষ্যতে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতার ওপরই কর্মসংস্থানের টেকসইতা নির্ভর করবে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে দেশে উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান প্রায় ৮১ লাখে স্থির থাকলেও উৎপাদন বেড়েছে। অন্যদিকে সেবা খাতে প্রায় দুই কোটি ৫০ লাখ মানুষ কাজ করলেও এর বড় অংশই অনিরাপদ ও নিম্ন উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে নিয়োজিত। পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থায় অর্জিত দক্ষতা এবং শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের অমিল রয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষায় (টিভিইটি) ভর্তি ২০ শতাংশেরও কম এবং শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ।
আরও পড়ুন: কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে ২৫১ পদে বড় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন এসএসসি-এইচএসসি পাসেই
সিপিডি জানায়, জাতীয় ও বৈশ্বিক ২৭টি পরিবর্তনশীল উপাদান বিশ্লেষণ করে ২০৩৫ সালের জন্য চারটি সম্ভাব্য শ্রমবাজারের চিত্র তৈরি করা হয়েছে। তবে সব পরিস্থিতিতেই পাঁচটি বিষয় অভিন্ন থাকবে—ডিজিটালায়ন অপরিবর্তনীয় হবে, কর্মসংস্থান উচ্চমূল্যের সেবাখাতে স্থানান্তরিত হবে, দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থা পিছিয়ে থাকবে, বৈশ্বিক ধাক্কার ঝুঁকি অব্যাহত থাকবে এবং সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ওপর।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান নীতিমালায় চারটি বড় ঘাটতি রয়েছে। এগুলো হলো—প্ল্যাটফর্ম ও গিগ অর্থনীতির শ্রমিকদের জন্য সমন্বিত নীতিকাঠামোর অভাব, অটোমেশনের প্রভাব নীতিনির্ধারণে যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হওয়া, দক্ষতা উন্নয়ন পরিকল্পনায় বাস্তব চাহিদার প্রতিফলনের ঘাটতি এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রোডম্যাপের অনুপস্থিতি।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সিপিডি কয়েকটি সুপারিশও করেছে। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পের চাহিদাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা সংস্কার, জীবনব্যাপী পুনঃদক্ষতা (রিস্কিলিং) কর্মসূচি চালু, কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিল্প প্রণোদনা যুক্ত করা, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জাতীয় শ্রমবাজার তথ্যব্যবস্থা (এলএমআইএস) গড়ে তোলা, গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং নারী, তরুণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান কৌশল গ্রহণ।
আরও পড়ুন: সামুদ্রিক অর্থনীতিতে সম্ভাবনা থেকে বাস্তবায়নের পথ সুগম করা প্রয়োজন: আশিক চৌধুরী
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের শ্রমবাজার এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার জোরদার করা না গেলে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়া কঠিন হবে।
ওয়েবিনারে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে, সেই সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে কর্মসংস্থানের কাঠামোও। কিন্তু নীতিনির্ধারকেরা এই পরিবর্তনের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। তিনি বলেন, এর পেছনে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া কাঠামোগত সমস্যা, শ্রমবাজার ও কর্মসংস্থানের মধ্যে অমিল, দক্ষতার ঘাটতি, ভৌগোলিক বৈষম্য এবং এআই ও অটোমেশনের দ্রুত অগ্রগতির মতো বিষয়গুলো কাজ করছে।

