সরকারের প্রস্তাবিত নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগে সুবিধা পাবেন সারাদেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত পৌনে ৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী। তাদের জন্যও জুলাইয়ে বড় ধরনের আর্থিক সুবিধার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন বাড়ানোর যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তার আওতায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থবিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আরও পড়ুন: স্কুল-কলেজের জন্য মাউশির জরুরি নির্দেশনা
দুই মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, সরকারি পর্যায়ে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। তবে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে শতভাগ পর্যন্ত বেতন বাড়ানোর আলোচনাও রয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে এমপিভুক্ত ২৬ হাজার ৯৩টি প্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবই রয়েছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৮৯৮।
অধ্যক্ষ থেকে অফিস সহায়ক– সব স্তরেই বাড়ছে বেতন
পে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, চতুর্থ গ্রেডভুক্ত এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষদের বর্তমান ৫০ হাজার টাকার মূল বেতন ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে, তা গিয়ে দাঁড়াবে ৭৫ হাজার টাকায়।
ষষ্ঠ গ্রেডের সহকারী অধ্যাপকদের বর্তমান ৩৫ হাজার ৫০০ টাকার বেসিক বেড়ে হতে পারে ৫৩ হাজার ২৫০ টাকা। সপ্তম গ্রেডের উপাধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষকদের ২৯ হাজার টাকার মূল বেতন বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৪৩ হাজার ৫০০ টাকায়।
একইভাবে, নবম গ্রেডের কলেজ প্রভাষকদের বর্তমান ২২ হাজার টাকার বেতন বেড়ে ৩৩ হাজার টাকা এবং দশম গ্রেডের বিএডধারী সহকারী শিক্ষকদের ১৬ হাজার টাকার বেসিক বেড়ে ২৪ হাজার টাকায় উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আরও পড়ুন: শিক্ষাবৃত্তি দেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, আবেদন করতে পারবেন যারা
নিম্ন গ্রেডে দ্বৈত হিসাব
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডভুক্ত বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য দুই ধরনের হিসাব সামনে এসেছে। একটিতে ৫০ শতাংশ এবং অন্যটিতে ১০০ শতাংশ বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।
১১তম গ্রেডের বিএডবিহীন সহকারী শিক্ষকদের বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকার বেসিক ৫০ শতাংশ বাড়লে, তা হবে ১৮ হাজার ৭৫০ টাকা। শতভাগ কার্যকর হলে তা গিয়ে দাঁড়াবে ২৫ হাজার টাকায়। ১৬তম গ্রেডের অফিস সহকারী কাম হিসাব সহকারী ও অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটরদের ৯ হাজার ৩০০ টাকার বেসিক ৫০ শতাংশ বাড়লে হবে ১৩ হাজার ৯৫০ টাকা এবং দ্বিগুণ হলে দাঁড়াবে ১৮ হাজার ৬০০ টাকায়।
একইভাবে, ১৮তম গ্রেডের ল্যাব সহকারীদের বর্তমান ৮ হাজার ৮০০ টাকার মূল বেতন ৫০ শতাংশ বাড়লে হবে ১৩ হাজার ২০০ টাকা এবং ১০০ শতাংশ বাড়লে হবে ১৭ হাজার ৬০০ টাকা। ২০তম গ্রেডের অফিস সহায়ক, নৈশপ্রহরী, নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও আয়াদের ৮ হাজার ২৫০ টাকার বেসিক ৫০ শতাংশ বাড়লে দাঁড়াবে ১২ হাজার ৩৭৫ টাকা। আর শতভাগ কার্যকর হলে তারা পাবেন ১৬ হাজার ৫০০ টাকা।
বাড়ি ভাড়ার দ্বিতীয় ধাপ কার্যকর জুলাই থেকে
এদিকে, বেতনের পাশাপাশি বাড়ছে এমপিওভুক্তদের বাড়িভাড়া ভাতাও। গত বছরের ২১ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয় এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়িভাড়া ভাতা দুই ধাপে মোট ১৫ শতাংশ বাড়ানোর অনুমোদন দেয়।
আরও পড়ুন: ফেলোশিপে পিএইচডির সুযোগ, করুন আবেদন
প্রথম ধাপে গত বছরের নভেম্বর থেকে মূল বেতনের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া কার্যকর হয়েছে। আগামী ১ জুলাই থেকে দ্বিতীয় ধাপে, আরও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ যুক্ত হয়ে মোট বাড়িভাড়া ভাতা দাঁড়াবে মূল বেতনের ১৫ শতাংশে। তবে সর্বনিম্ন ভাতা ২ হাজার টাকা নির্ধারিত থাকবে।
তিন ধাপে বাস্তবায়ন হবে নতুন পে স্কেল
সরকার আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, তিন অর্থবছরে তিন ধাপে এটি কার্যকর করা হবে।
প্রথম বছরে বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ, দ্বিতীয় বছরে পুরো মূল বেতন এবং তৃতীয় বছরে বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা নতুন কাঠামো অনুযায়ী সমন্বয় করা হবে।
সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজারের প্রস্তাব
সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন চলতি বছরের জানুয়ারিতে নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ জমা দেয়। সেখানে বর্তমান সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়।
বর্তমান কাঠামোর মতোই ২০টি গ্রেড বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে সচিব ও সমপর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা ধাপ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
আরও পড়ুন: শিক্ষাবৃত্তি দেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, আবেদন করতে পারবেন যারা
‘এমপিও শিক্ষকরা দীর্ঘদিন বৈষম্যের শিকার’
এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের মহাসচিব অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজিজী সমকালকে বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক বৈষম্যের শিকার। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আসন্ন বাজেটে সরকার বেতন বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে।

