হকারি থেকে জনপ্রিয় গীতিকার, শব্দেই নিজের ঠিকানা গড়েছেন মারজুক রাসেল

জিটি ডেস্ক

প্রকাশ:

গানের জগতে নিজের ভাষা তৈরি করেছেন মারজুক
গানের জগতে নিজের ভাষা তৈরি করেছেন মারজুক|ছবি: সংগৃহীত

কখনো অনাহার, কখনো ফুটপাতে হকারি, কখনো সিনেমার টিকিট বিক্রি—জীবনের কঠিন সময়গুলো পেরিয়েছেন তিনি। বেঁচে থাকার সংগ্রাম যতই কঠিন হোক, শব্দকে কখনো ছাড়েননি। কবিতা লিখেছেন, গান লিখেছেন। সেই শব্দই একসময় তাকে পৌঁছে দিয়েছে বাংলা গানের অন্যতম জনপ্রিয় গীতিকার হিসেবে। তিনি মারজুক রাসেল—কবি, গীতিকার, অভিনেতা ও মডেল। তবে সব পরিচয়ের গভীরে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে তাঁর গীতিকারের সত্তা।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা

মারজুক রাসেলের গান মানেই প্রচলিত কথার বাইরে গিয়ে জীবনের অন্য এক ভাষা। প্রেম, বিরহ, উন্মাদনা কিংবা নিঃসঙ্গতা—তার গানের কথায় মিশে থাকে নাগরিক জীবনের চেনা-অচেনা নানা অনুভূতি। শব্দ বাছাইয়ের নিজস্ব ধরন আর অপ্রচলিত উপমার কারণে তাঁর লেখা গান সহজেই আলাদা হয়ে যায়।

গোপালগঞ্জে জন্ম হলেও শৈশব-কৈশোর কেটেছে খুলনার দৌলতপুরে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ‘জনবার্তা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতা। তখন তিনি মাদ্রাসার ছাত্র। ১৯৯৩ সালে জীবনের মোড় ঘোরানোর স্বপ্ন নিয়ে খুলনা থেকে ঢাকায় আসেন মারজুক। সামনে ছিল অনিশ্চয়তা, আর পকেটে ছিল স্বপ্ন। ঢাকায় এসে একসময় তোপখানা রোডের একটি গাড়ির গ্যারেজেও থাকতে হয়েছে তাকে। জীবিকার প্রয়োজনে সিনেমার টিকিট বিক্রি করেছেন, ফুটপাতে হকারি করেছেন। পরে কাজ নিয়েছেন একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে। পাশাপাশি লেখালেখি চালিয়ে গেছেন। ঢাকায় এসে আজিজ মার্কেটকেন্দ্রিক তরুণ লেখকদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। কবিতা ও গল্প লেখার পাশাপাশি শুরু করেন গান লেখা। ফারুক মামুনের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমে কাজের সুযোগ পান। পত্রপত্রিকায় লিখতে শুরু করেন। এই সময়ই সংগীতশিল্পী সঞ্জীব চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। মারজুকের লেখা পড়ে সঞ্জীব চৌধুরী তাকে নগরবাউল জেমসের সঙ্গে দেখা করার পরামর্শ দেন। জেমসের সঙ্গে সেই পরিচয়ই বদলে দেয় তাঁর জীবন। তখন জেমসের ‘লেইস ফিতা লেইস’ অ্যালবামের কাজ চলছিল। মারজুকের লেখা পড়ে তার প্রতিভায় মুগ্ধ হন জেমস। এরপর শুরু হয় দুজনের দীর্ঘ পথচলা।

আরও পড়ুন: জুলাই-জুনের পরিবর্তে এপ্রিল-মার্চে হচ্ছে দেশের অর্থবছর

জেমসের কণ্ঠে মারজুক রাসেলের লেখা একের পর এক গান জনপ্রিয় হতে থাকে। ‘মীরা বাঈ’, ‘পত্র দিও’, ‘শরাবে শরাব’, ‘হা ডু ডু’, ‘আমি ভাসব যে জলে, তোমায় ভাসাবো সেই জলে’, ‘দে দূরে’, ‘বাইসকুপের খেলা’, ‘রাখে আল্লাহ মারে কে’, ‘হাউজি’, ‘তেরো নদী সাত সমুদ্র’—এসব গানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর নিজস্ব শব্দভঙ্গি। শুধু জেমসের জন্যই নয়, আইয়ুব বাচ্চুর কণ্ঠেও মারজুকের লেখা বেশ কিছু গান শ্রোতাপ্রিয়তা পেয়েছে। ‘আমি তো প্রেমে পড়িনি, প্রেম আমার উপরে পড়েছে’, ‘ললনা’, ‘তোমার চোখে দেখলে বন্ধু’—এসব গানেও ফুটে উঠেছে তাঁর স্বতন্ত্র গীতিকাব্য। এর বাইরে পান্থ কানাই, ইশান কোণ, আসিফ আকবর, হাবিব ওয়াহিদ, আরেফিন রুমিসহ আরও অনেক শিল্পীর জন্য গান লিখেছেন মারজুক। ‘দ্বিধা’, ‘দোলনা’, ‘গোল্লা’, ‘বায়ু’, ‘ও আমার পাগলা ঘোড়া রে’, ‘সবার বাংলাদেশ’, ‘তুমি হারিয়ে যাওয়ার সময় আমায় সঙ্গে নিও’, ‘নারী’, ‘বদলে’, ‘মিল’, ‘মাইথ’, ‘জলকন্যা’, ‘ফুঁ’—বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে তাঁর লেখা গান শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি পেয়েছে।

গীতিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই কবি হিসেবে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন মারজুক। ২০০০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘শান্টিং ছাড়া সংযোগ নিষিদ্ধ’। এরপর প্রকাশিত হয়েছে ‘চাঁদের বুড়ির বয়স যখন ষোলো’, ‘বাঈজি বাড়ি রোড’, ‘ছোট্ট কোথায় টেনিস বল’। দীর্ঘ বিরতির পর প্রকাশিত হয় ‘দেহবণ্টনবিষয়ক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর’ ও ‘হাওয়া দেখি, বাতাস খাই’। তবে সৃজনশীলতার পরিধি কবিতা ও গানে আটকে থাকেনি। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ব্যাচেলর’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয়ে অভিষেক হয় তাঁর। এরপর মেড ইন বাংলাদেশ’, ‘রাত্রীর যাত্রী’, ‘সাপলুডু’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। পাশাপাশি নাটক, বিজ্ঞাপন ও মিউজিক ভিডিওতেও দেখা গেছে তাকে।

আরও পড়ুন: বিলুপ্ত হচ্ছে র‍্যাব, মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন

মারজুক রাসেলের গল্প তাই শুধু একজন কবি কিংবা গীতিকারের সাফল্যের গল্প নয়। এটি নিজের জায়গা তৈরি করে নেওয়া এক মানুষের গল্প। যে মানুষটি একসময় অভাবের সঙ্গে লড়েছেন, অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকেছেন, কাজের সন্ধানে ঘুরেছেন—সেই মানুষটিই পরে বাংলা গানের জনপ্রিয় কিছু লাইনের স্রষ্টা হয়েছেন। হয়তো জীবনের সেই কঠিন দিনগুলোই তাঁর শব্দকে দিয়েছে আলাদা গভীরতা। তাই আজও কবি ও গীতিকার মারজুক রাসেলের নাম উচ্চারিত হলে মনে পড়ে এমন একজন স্রষ্টার কথা, যিনি প্রচলিত শব্দের ভিড়ে নিজের জন্য তৈরি করেছেন একেবারেই আলাদা একটি ভাষা

মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!