যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি দুই শিক্ষার্থী হত্যার তদন্তে নতুন মোড়

জিটি ডেস্ক

প্রকাশ:

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি দুই শিক্ষার্থী নাহিদ-বৃষ্টি হত্যার তদন্তে নতুন মোড়
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি দুই শিক্ষার্থী নাহিদ-বৃষ্টি হত্যার তদন্তে নতুন মোড়|ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টির হত্যাকাণ্ডে উঠে এসেছে নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য। ডিজিটাল ও ফরেনসিক প্রমাণ তাদের জীবনের শেষ মুহূর্তের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। বিশেষ করে লিমনের বাসার চাবি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার অস্বাভাবিক কিছু রেকর্ড এই মামলার তদন্তে নতুন দিক উন্মোচন করেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, অভিযুক্ত ব্যক্তি ভুক্তভোগীদের নিয়ন্ত্রণে নিতে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে কাজ করেছে। ১৬ এপ্রিল সকালের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে গোয়েন্দারা মনে করছেন, এটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং মানসিক নিপীড়নের একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ।

আরও পড়ুন: ঢাবি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা: কারাগারে পাঠানো হলো শিক্ষক সুদীপকে

তদন্তে সবচেয়ে রহস্যজনক বিষয়গুলোর একটি হলো লিমনের অ্যাপার্টমেন্টের চাবি। তিনি রুমমেট হিশাম সালেহ আবুঘারবিয়াহর সঙ্গে সেখানে বসবাস করতেন। হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকা থেকে লিমনের মরদেহ উদ্ধারের পর অভিযুক্তের বাসা ও ব্যবহৃত গাড়িতে তল্লাশি চালিয়েও চাবিটি পাওয়া যায়নি। পরে ভবনের ডিজিটাল অ্যাক্সেস লগ পরীক্ষা করে ফরেনসিক দল জানতে পারে, নিখোঁজ হওয়ার দিন সকাল ৯টা ৪১ মিনিটে একটি ডুপ্লিকেট কি-কার্ড তৈরি ও ব্যবহার করা হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, তখন লিমন ল্যাবে ছিলেন এবং অভিযুক্ত আগেই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে অ্যাপার্টমেন্টে প্রবেশের ব্যবস্থা করে রেখেছিল।

নাহিদা বৃষ্টির ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ‘অস্বাভাবিক’ কিছু কার্যকলাপের রেকর্ড পাওয়া গেছে। নিখোঁজ হওয়ার ঠিক আগে স্মার্ট-হোম সিস্টেমের তথ্যে দেখা যায়, তিনি নিরাপত্তা প্যানেল ও ওই ডুপ্লিকেট কি-কার্ড ব্যবহার করে বারবার অ্যাক্সেস নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, তিনি হয়তো জরুরি পরিস্থিতিতে ছিলেন বা ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য মরিয়া চেষ্টা করছিলেন।

আরও পড়ুন: ঢাবি ছাত্রীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় শিক্ষক গ্রেপ্তার

এর কিছুক্ষণ পরই নাহিদাকে অভিযুক্ত হিশাম সালেহ আবুঘারবিয়াহর সঙ্গে অ্যাপার্টমেন্ট ত্যাগ করতে দেখা যায়। তার স্বাভাবিক আচরণের সঙ্গে এসব ডিজিটাল সংকেতের অমিল থেকে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, তিনি তখন চাপের মুখে ছিলেন বা কোনো অনুপ্রবেশকারীর হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন।

এই ইলেকট্রনিক তথ্যের সঙ্গে আগে পাওয়া ১৯ সেকেন্ডের ফোনকলের রহস্য যুক্ত হয়ে তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, সকাল ৯টা ৪১ মিনিটে ডুপ্লিকেট চাবি তৈরির ঘটনাই পুরো ঘটনার সূচনা করে এবং দুই শিক্ষার্থীকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। নাহিদা যখন নিরাপত্তা প্যানেলের সঙ্গে লড়ছিলেন, তখন অভিযুক্ত ইতোমধ্যে অ্যাপার্টমেন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।

এসব প্রমাণ আদালতে ‘ফার্স্ট-ডিগ্রি প্রিমেডিটেটেড মার্ডার’ বা পূর্বপরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এতে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়, অভিযুক্ত অত্যন্ত সচেতনভাবে ভুক্তভোগীদের নিজেদের বাসাতেই আটকে ফেলার পরিকল্পনা করেছিল।

বর্তমানে হিশাম সালেহ আবুঘারবিয়াহ জামিন ছাড়া আটক রয়েছেন। তার ব্যক্তিগত ডিভাইস থেকে আরও তথ্য উদ্ধার করছে ফরেনসিক দল। তার ল্যাপটপে ইলেকট্রনিক লক খোলার নির্দেশিকা এবং ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের প্রমাণ মিলেছে, যা ডুপ্লিকেট কি-কার্ড তৈরির ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তদন্তকারীদের মতে, এই প্রস্তুতি প্রমাণ করে অভিযুক্ত তার রুমমেটদের সহকর্মী হিসেবে দেখেনি, বরং পরিকল্পিত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল। বিপুল ডিজিটাল প্রমাণের কারণে ঘটনাটি এখন নিখোঁজের সীমা ছাড়িয়ে প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন: ৪৮১ ‘অমুক্তিযোদ্ধা’র গেজেট বাতিল

বাংলাদেশে থাকা নিহতদের পরিবারের কাছে প্রতিটি নতুন তথ্যই গভীর বেদনার। নাহিদার বাবা আবেগঘন কণ্ঠে মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তার মেয়ে বিজ্ঞানের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিল।

ডুপ্লিকেট চাবি ও নিরাপত্তা প্যানেলে নাহিদার শেষ চেষ্টা সম্পর্কে জানতে পেরে পরিবারটি চরম আঘাত ও বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতিতে ভুগছে। তারা মেনে নিতে পারছেন না, কীভাবে নিরাপদ বাসস্থান এমন নৃশংস ঘটনার কেন্দ্রে পরিণত হলো। এ ঘটনার পর ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার শিক্ষার্থীরা অফ-ক্যাম্পাস আবাসনের ইলেকট্রনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি তুলেছে।

আরও পড়ুন: জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি দিয়ে সংসদে বিল পাস

হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ অফিস জানিয়েছে, ওই ‘রহস্যময়’ সিস্টেম রেকর্ডই পুরো ঘটনার চিত্র স্পষ্ট করতে সহায়তা করবে। ১৯ সেকেন্ডের ফোনকল থেকে শুরু করে ডুপ্লিকেট কি-কার্ড—প্রতিটি তথ্য ভুক্তভোগীদের লড়াই ও অভিযুক্তের নির্মমতার প্রমাণ বহন করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দুই মেধাবী গবেষকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। জামিল লিমনের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞানে অবদান এবং নাহিদা বৃষ্টির রাসায়নিক প্রকৌশলে সম্ভাবনা দেশের জন্য গর্বের ছিল। এই ঘটনা গবেষকদের একাকী কাজের পরিবেশে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে।

আরও পড়ুন: শিক্ষা খাতে ৪৩টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে

আগামী সপ্তাহে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হলে সকাল ৯টা ৪১ মিনিটের সেই লগ থেকে আরও বিস্তারিত তথ্য সামনে আসতে পারে। রাষ্ট্রপক্ষের মতে, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর অভিযুক্তের এই নিয়ন্ত্রণ তার পরিকল্পিত ও সহিংস মানসিকতার প্রতিফলন। যে ডিজিটাল চিহ্নগুলো লুকানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, সেগুলোই এখন তাকে বিচারের মুখোমুখি করছে।

জামিল ও নাহিদার স্মৃতি তাদের মেধা ও পরিবারের প্রতি ভালোবাসার মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকবে। আর প্রতিটি প্রমাণ ও সময়চিহ্ন বিশ্লেষণের মাধ্যমে ন্যায়বিচারের পথে এগিয়ে চলেছে এই মামলা।

মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!