আর মাত্র এক সপ্তাহ পরই মাঠে গড়াবে ফুটবলের ‘গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’ খ্যাত বিশ্বকাপ। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই ফুটবলের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়মে পরিবর্তন এনেছে ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (আইএফএবি)। যদিও এসব নিয়ম ২০২৬-২৭ মৌসুম থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, তবে প্রথম বড় আসর হিসেবে আসন্ন বিশ্বকাপেই সেগুলোর প্রয়োগ দেখা যাবে। নতুন নিয়মগুলোর লক্ষ্য মাঠে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, সময় অপচয় কমানো, ম্যাচের গতি বাড়ানো এবং খেলোয়াড়-দর্শকদের অভিজ্ঞতা উন্নত করা।
ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়েরলুইজি কলিনা জানিয়েছেন, এই পরিবর্তনগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো মাঠে বৈষম্য দূর করা, সময় অপচয় কমানো, খেলার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং ফুটবলকে আরও উপভোগ্য করে তোলা।
মুখ ঢেকে রাখলেই সরাসরি লাল কার্ড
মাঠে কোনো উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বা সংঘাতের সময় কোনো খেলোয়াড় হাত কিংবা জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে কথা বললে রেফারি তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখাতে পারবেন। বেনফিকার আর্জেন্টাইন ফুটবলার জিয়ানলুকা প্রেসতিয়ানি মুখ ঢেকে রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাজিলিয়ান তারকা ভিনিসিয়াস জুনিয়রের প্রতি বর্ণবাদী মন্তব্য করার অভিযোগের পর এই কঠোর নিয়ম প্রণয়ন করা হয়েছে।
তবে সতীর্থদের সঙ্গে স্বাভাবিক বা বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপের সময় মুখ ঢেকে কথা বললে কোনো শাস্তি দেওয়া হবে না।
আরও পড়ুনঃ বিশ্বকাপের সময় কর্মঘণ্টা হারিয়ে ১৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির আশঙ্কা
প্রতিবাদে মাঠ ছাড়লে কঠোর শাস্তি
রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে কোনো দল বা খেলোয়াড় মাঠ ছেড়ে চলে গেলে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখানো হবে। একই সঙ্গে কোনো কোচ বা কর্মকর্তা খেলোয়াড়দের মাঠ ছাড়তে প্ররোচিত করলে তার বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ছাড়া কোনো দলের কারণে ম্যাচ পরিত্যক্ত হলে প্রতিপক্ষকে ৩-০ ব্যবধানে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে। আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে পেনাল্টির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সেনেগাল দলের মাঠ ত্যাগের ঘটনার পর এমন বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
থ্রো-ইন ও গোল-কিকে ৫ সেকেন্ডের কাউন্টডাউন
সময় নষ্ট রোধে রেফারিরা হাত উঁচিয়ে দৃশ্যমান ৫ সেকেন্ডের কাউন্টডাউন শুরু করবেন। কোনো দল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে থ্রো-ইন নিতে না পারলে বলের দখল প্রতিপক্ষের কাছে চলে যাবে।
অন্যদিকে গোল-কিক নেওয়ার ক্ষেত্রেও নির্ধারিত সময়সীমা মানতে হবে। সময়মতো কিক নিতে ব্যর্থ হলে প্রতিপক্ষ দল কর্নার কিক পাবে।
খেলোয়াড় বদলের নতুন নিয়ম
পরিবর্তিত নিয়ম অনুযায়ী, মাঠ থেকে তুলে নেওয়া খেলোয়াড়কে বাউন্ডারি লাইনের নিকটতম অংশ দিয়ে সর্বোচ্চ ১০ সেকেন্ডের মধ্যে মাঠ ত্যাগ করতে হবে।
যদি কোনো খেলোয়াড় ইচ্ছাকৃতভাবে ১০ সেকেন্ডের বেশি সময় নেন, তাহলে তার বদলি খেলোয়াড় সঙ্গে সঙ্গে মাঠে নামতে পারবেন না। খেলা পুনরায় শুরু হওয়ার পর অন্তত এক মিনিট অতিবাহিত হলে এবং পরবর্তীবার খেলা বন্ধ হওয়ার সময় রেফারির অনুমতি নিয়ে তিনি মাঠে প্রবেশ করবেন।
তবে চোটজনিত কারণে মাঠ ছাড়ার ক্ষেত্রে এই নিয়ম কার্যকর হবে না।
চিকিৎসার পর এক মিনিট মাঠের বাইরে
কোনো খেলোয়াড়ের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক দল মাঠে প্রবেশ করলে চিকিৎসা শেষে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে এক মিনিট মাঠের বাইরে থাকতে হবে।
তবে গোলরক্ষকের চোট, গোলরক্ষক ও আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের সংঘর্ষ, একই দলের দুই খেলোয়াড়ের সংঘর্ষ, মাথায় গুরুতর আঘাত অথবা পেনাল্টি নিতে নির্ধারিত খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে এই নিয়মে ছাড় দেওয়া হবে।
ভিএআরের পরিধি আরও বিস্তৃত
২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে প্রথমবার চালু হওয়া ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) প্রযুক্তির ব্যবহার এবার আরও বাড়ানো হয়েছে।
এখন থেকে স্পষ্ট ভুল সিদ্ধান্তের কারণে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখিয়ে কাউকে লাল কার্ড দেওয়া হলে কিংবা ভুল খেলোয়াড়কে কার্ড দেখানো হলে ভিএআরের মাধ্যমে তা পর্যালোচনা করা যাবে।
এ ছাড়া ভুলভাবে কর্নার কিক দেওয়া হলে বা ম্যাচ পুনরায় শুরু হওয়ার ঠিক আগে সংঘটিত কোনো ফাউলের ক্ষেত্রেও ভিএআর হস্তক্ষেপ করতে পারবে।
তিন মিনিটের ‘হাইড্রেশন ব্রেক’
খেলোয়াড়দের শারীরিক স্বস্তি নিশ্চিত করতে প্রতিটি অর্ধের মাঝামাঝি সময়ে, অর্থাৎ প্রায় ২২তম মিনিটের কাছাকাছি তিন মিনিটের ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ রাখা হবে।
তবে ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনায় রেফারি এই বিরতির সময় কিছুটা এগিয়ে বা পিছিয়ে নিতে পারবেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০তম মিনিটে কোনো খেলোয়াড় আহত হলে তখনই বিরতির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
গোলরক্ষকের চিকিৎসার সময় বিশেষ নিষেধাজ্ঞা
ম্যাচ চলাকালে কোনো গোলরক্ষক মাঠের ভেতরে চিকিৎসা নিলে দুই দলের কোনো খেলোয়াড়ই মাঠের বাইরে যেতে পারবেন না।
এ সময় সাইডলাইনে গিয়ে কোচদের সঙ্গে কৌশলগত আলোচনা কিংবা অনানুষ্ঠানিক ‘টাইমআউট’ নেওয়ার সুযোগও থাকবে না। নতুন এই বিধানের মাধ্যমে চিকিৎসার অজুহাতে খেলা থামিয়ে কৌশলগত সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

