বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচের আগে সাধারণত কোচেরা অনেক কিছুই আড়াল করে রাখেন। ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তিও এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রাজিলের একাদশ ঘোষণা করেননি। তবে নিউ জার্সিতে মরক্কোর বিপক্ষে নামার আগে পুরো সপ্তাহের অনুশীলন একটি পরিষ্কার ইঙ্গিত দিয়েছে, বড় কোনো চমকের পথে হাঁটতে চান না ব্রাজিল কোচ। বরং শুরুতে অভিজ্ঞতাকেই ভরসা বানাতে চান তিনি।
অনুশীলনে যে দলটি বারবার দেখা গেছে, তাতে ২০২২ বিশ্বকাপের ওপেনারে সার্বিয়ার বিপক্ষে খেলা আটজন ফুটবলার আছেন। আলিসন, দানিলো, মারকিনিয়োস, অ্যালেক্স সান্দ্রো, কাসেমিরো, লুকাস পাকেতা, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রাফিনিয়া, চার বছর আগের সেই শুরু থেকে এবারও ব্রাজিলের সম্ভাব্য একাদশে তাদের থাকা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এক বিশ্বকাপের ওপেনার থেকে পরের বিশ্বকাপের ওপেনারে এত বেশি ফুটবলার ধরে রাখার ঘটনা ব্রাজিলের ক্ষেত্রে খুব নিয়মিত নয়।
এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই আছে নতুন বাস্তবতাও। নেইমার নেই। চোট কাটিয়ে এখনো পূর্ণ অনুশীলনে ফিরতে পারেননি ব্রাজিলের ১০ নম্বর। আনচেলত্তি জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে তাকে পূর্ণ অনুশীলনে ফেরানোর আশা করা হচ্ছে। তাই মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলকে শুরু করতে হচ্ছে নিজেদের সবচেয়ে পরিচিত সৃজনশীল মুখটিকে ছাড়াই।
নেইমারের অনুপস্থিতিতে আক্রমণের দায়িত্ব আরও বেশি পড়বে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া, লুকাস পাকেতা ও মাতেউস কুনিয়ার ওপর। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে আনচেলত্তির অধীনে বড় ম্যাচের চাপ সামলাতে শিখেছেন ভিনিসিয়ুস। এখন জাতীয় দলের জার্সিতে সেই পরিণতিই দেখতে চাইবে ব্রাজিল। রাফিনিয়ার গতি ও ভেতরে ঢুকে শট নেওয়ার সামর্থ্য, পাকেতার সৃষ্টিশীল পাসিং এবং কুনিয়ার মুভমেন্ট, সব মিলিয়ে নেইমারহীন আক্রমণ কতটা কার্যকর হতে পারে, প্রথম ম্যাচেই তার পরীক্ষা।
তবে আনচেলত্তির ভাবনায় শুধু আক্রমণ নেই। বড় জায়গাজুড়ে আছে সেট পিসও। শেষ দিকের অনুশীলনে আক্রমণ ও রক্ষণ, দুই ক্ষেত্রেই কর্নার, ফ্রি-কিক এবং ডেড-বল পরিস্থিতি নিয়ে আলাদা কাজ করানো হয়েছে। আধুনিক বিশ্বকাপে এই জায়গাগুলোই অনেক সময় ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়। বিশেষ করে মরক্কোর মতো শারীরিকভাবে শক্তিশালী, সংগঠিত ও আত্মবিশ্বাসী দলের বিপক্ষে সেট পিসে ছোট ভুলও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
ব্রাজিলের শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে আক্রমণের পরিমাণ আনচেলত্তিকে সন্তুষ্ট করলেও ফিনিশিং নিয়ে তার অস্বস্তি ছিল। দল সুযোগ তৈরি করেছে, বক্সে খেলোয়াড় ঢুকেছে, জায়গা দখল করেছে, কিন্তু শেষ কাজটা যথেষ্ট ধারালো হয়নি। সে কারণেই শেষ অনুশীলনে ফরোয়ার্ডদের দিয়ে বক্সের বাইরে থেকে সমন্বিত আক্রমণ ও শট নেওয়ার অনুশীলন করানো হয়েছে। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে সুযোগ বেশি আসে না, আর মরক্কোর বিপক্ষে তো আরও কম আসার কথা। তাই সুযোগ পেলে সেটি কাজে লাগানোই হবে ব্রাজিলের বড় পরীক্ষা।
আরও পড়ুনঃ হঠাৎ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বললেন উইলিয়ামসন
একাদশে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম হলেও আনচেলত্তি বিকল্প পরিকল্পনাও দেখে রেখেছেন। অনুশীলনে অ্যালেক্স সান্দ্রোর জায়গায় ডগলাস সান্তোস, মাতেউস কুনিয়ার জায়গায় ইগর থিয়াগো এবং ডান দিকে লুইজ হেনরিকেকে পরীক্ষা করা হয়েছে। অর্থাৎ শুরুতে অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করলেও ম্যাচের ভেতর গতি, উচ্চতা কিংবা সরাসরি আক্রমণের দরকার হলে বদল আনার প্রস্তুতি আছে ব্রাজিলের।
মরক্কোকে নিয়ে সতর্ক থাকার যথেষ্ট কারণও আছে ব্রাজিলের। ২০২২ বিশ্বকাপে স্পেন ও পর্তুগালকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠা দলটি এখন আর শুধু চমকের গল্প নয়। বড় দলের বিপক্ষে কীভাবে অপেক্ষা করতে হয়, কীভাবে জায়গা বন্ধ করতে হয় এবং সুযোগ পেলে দ্রুত আঘাত করতে হয়, সেটি তারা ভালোই জানে। তাই ব্রাজিলের জন্য এটি কোনো সহজ ওপেনার নয়। বরং প্রথম ম্যাচেই তাদের সামনে এমন এক প্রতিপক্ষ, যারা ব্রাজিলের প্রতিটি ভুলের অপেক্ষায় থাকবে।
গ্রুপ ‘সি’র ম্যাচটি হবে নিউ জার্সির নিউইয়র্ক/নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে। স্থানীয় সময় শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় শুরু হবে খেলা, বাংলাদেশ সময় রোববার ভোর ৪টায়। একই গ্রুপে আছে হাইতি ও স্কটল্যান্ড। তবে গ্রুপের সবচেয়ে বেশি আলো পড়ছে ব্রাজিল-মরক্কো ম্যাচেই।
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল জানে, বিশ্বকাপে তাদের কাছে শুধু জয় নয়, ভরসা ফেরানোর দাবিও থাকে। আনচেলত্তি সেই ভরসা ফেরানোর শুরুটা করতে চাইছেন পুরোনো পরীক্ষিত মুখদের ওপর নির্ভর করেই।
মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের সম্ভাব্য একাদশ
আলিসন; দানিলো, মারকিনিয়োস, গ্যাব্রিয়েল মাগালিয়াইস, অ্যালেক্স সান্দ্রো; কাসেমিরো, ব্রুনো গিমারায়েস; লুকাস পাকেতা, মাতেউস কুনিয়া, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া।

