রোমাঞ্চকর এক জয়ের মধ্য দিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠেছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। উইমেন’স সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে নেপালকে ২–১ গোলে হারিয়ে শেষ চার থেকে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে পিটার জেমস বাটলারের দল।
গোয়ার জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে বুধবার অনুষ্ঠিত প্রথম সেমিফাইনালে যোগ করা সময়ের শেষ মুহূর্তে নেপালের আত্মঘাতী গোলে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত হয়। শামসুন্নাহার জুনিয়র বাম দিক থেকে দারুণ গতিতে বক্সে ঢুকে গোলমুখে বল বাড়ালে সেটি ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের জালেই জড়িয়ে দেন নেপালের মিডফিল্ডার প্রীতি রায়। সেই মুহূর্তেই উল্লাসে ফেটে পড়ে বাংলাদেশ শিবির।
এই জয়ের মাধ্যমে সাফের গত দুই আসরের ফাইনালের পুনরাবৃত্তি ঘটল আবারও। নেপালকে তাদের মাঠেই হারিয়ে আগের দুইবার শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের ফাইনালের স্কোরলাইনের ছায়া যেন আবারও দেখা গেল গোয়ার এই সেমিফাইনালে।
ম্যাচে বাংলাদেশ কোচ পিটার জেমস বাটলার তিনটি পরিবর্তন এনে একাদশ সাজান। ভারত ম্যাচে খেলা মনিকা চাকমা, শামসুন্নাহার জুনিয়র ও সুরমা জান্নাতের জায়গায় সুযোগ পান আফঈদা খন্দকার, উমহেলা মারমা ও সুরভি আকন্দ প্রীতি। আগের দিন মাকে হারানো অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার শিউলি আজমিকেও রাখা হয় বেঞ্চে।
শুরুর দিক থেকেই অবশ্য বাংলাদেশ ছন্দ খুঁজে পেতে ভুগছিল। মাঝমাঠে পাসিং ছিল অগোছালো, রক্ষণেও দেখা যায় সমন্বয়ের ঘাটতি। এই সুযোগে ম্যাচে আধিপত্য তৈরি করে নেপাল। ২২তম মিনিটে এগিয়েও যায় তারা।
কর্নার থেকে আসা বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে মিলি আক্তারের দুর্বল ফিস্টিংয়ে বল পুরোপুরি দূরে যায়নি। বক্সের ভেতরের জটলার মধ্যে সুযোগ কাজে লাগিয়ে গীতা রানী চিপ শটে বল জালে পাঠান। তবে পরের মিনিটেই পাল্টা আক্রমণে নেপালের রক্ষণে চাপ তৈরি করলেও বাংলাদেশ গোলরক্ষকের পরীক্ষা নিতে পারেনি।
৩৪তম মিনিটে আবারও ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পায় নেপাল। রাসি কুমারি ঘিসিংয়ের হেড রুখে দেন মিলি আক্তার। কিছুক্ষণ পর প্রীতি রায়ের জোরালো শট লাফিয়ে পড়ে কোনোভাবে ঠেকান তিনি, বল ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে।
বাংলাদেশের খেলায় তখনো ছিল ছন্নছাড়া ভাব। কখনও তাড়াহুড়ো, কখনও ভুল পাস—ফলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হচ্ছিল বারবার। রাইট ব্যাক কোহাতি কিসকু-ও রক্ষণে কয়েকবার ভুল করলে নেপালের আক্রমণের সুযোগ তৈরি হয়।
খেলার গতি ফেরাতে ৩৮তম মিনিটে কোচ বাটলার দুটি পরিবর্তন আনেন। উমহেলা মারমা ও সুরভি আকন্দ প্রীতিকে তুলে মাঠে নামান অভিজ্ঞ শামসুন্নাহার জুনিয়র ও তহুরা খাতুন। এরপর থেকেই ম্যাচে গতি পেতে শুরু করে বাংলাদেশ।
প্রথমার্ধের একেবারে শেষ মুহূর্তে সমতায় ফেরে বাংলাদেশ। ৪৫তম মিনিটে ডান দিক থেকে নেওয়া ঋতুপর্ণার কর্নারে বল বাতাসে ভেসে গিয়ে গোলকিপার আঞ্জিলা সুব্বাকে ফাঁকি দেয় এবং দূরের পোস্টে লেগে জালে জড়িয়ে যায়। এই গোলেই বিরতিতে সমতায় ফেরে বাংলাদেশ।
দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ শুরু করে মোমিতা খাতুনের জায়গায় মনিকাকে নামিয়ে। শুরুতেই আবারও ভাগ্যের সহায়তা পায় দল, যখন নেপালের একটি শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। এরপর আরেকটি শট যায় ক্রসবারের ওপর দিয়ে।
৫৪তম মিনিটে বড় সুযোগ নষ্ট করেন শামসুন্নাহার জুনিয়র। ডান দিক দিয়ে ঢুকে তিনি শট নিলেও দূরের পোস্টে ফাঁকায় দাঁড়িয়ে থাকা তহুরাকে পাস না দিয়ে নিজেই চেষ্টা করেন। কিছুক্ষণ পর মনিকার হেডও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
আরও পড়ুনঃ ১৯৫৮ সালে বিশ্বকাপ জয়ী পেলের জার্সি উঠছে নিলামে
৬৮তম মিনিটে আবারও বিপদে পড়ে বাংলাদেশ। সারু লিম্বুর শট মিলির হাত ছুঁয়ে ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। এরপর বাংলাদেশ কোচ আনিকা রানিয়া সিদ্দিকীর জায়গায় সাগরিকাকে নামান।
নির্ধারিত সময়ের দুই মিনিট আগে আফঈদা ইশারা দিয়ে খেলা থামান পানির বিরতির জন্য। সেই সুযোগে দুই দলের খেলোয়াড়রাই পানি পান করে নেয়। বিরতির পর নেপালের একটি আক্রমণ কোহাতি কর্নারের বিনিময়ে ক্লিয়ার করেন।
ছয় মিনিটের যোগ করা সময়ের শুরুতেই আসে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত। বাম দিক থেকে আসা পাস ধরে দ্রুত বক্সে ঢুকে যান শামসুন্নাহার জুনিয়র। ঠাণ্ডা মাথায় তিনি বল গোলমুখে বাড়ালে সেটি ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের জালে পাঠিয়ে দেন প্রীতি রায়।
এরপরই মাঠে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। কোহাতি কিসকু চোট পেয়ে স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়েন। খেলা আবার শুরু হলে নেপালের নিশা থোকারের শট মিলি আক্তার ধরে ফেলেন। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ফাইনালে ওঠার আনন্দে মেতে ওঠে বাংলাদেশ দল।
এই জয়ের ফলে টানা তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠল বাংলাদেশ। অন্যদিকে সর্বোচ্চ ছয়বার ফাইনাল খেলেও এখনো শিরোপা না পাওয়া নেপালের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হলো।
পরিসংখ্যানেও বাংলাদেশ ও নেপালের লড়াই এখন সমতায়। দুই দলের মুখোমুখি ১৪ ম্যাচে বাংলাদেশ ও নেপাল সমান ছয়টি করে জয় পেয়েছে, বাকি দুটি ম্যাচ ড্র হয়েছে।

