মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে হোয়াইটওয়াশ করার দারুণ সুযোগ ছিল বাংলাদেশের সামনে। শেষ ম্যাচেও জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল স্বাগতিকরা। তবে কুপার কনোলির দুর্দান্ত সেঞ্চুরি আর শেষ উইকেট জুটির দৃঢ়তায় তৃতীয় ওয়ানডেতে ১ উইকেটের রোমাঞ্চকর জয় তুলে নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ফলে বাংলাওয়াশের সুযোগ হাতছাড়া হলেও ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতে নিয়েছে বাংলাদেশ।
শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে আগে ব্যাট করে ৫ উইকেটে ২৭৪ রান তোলে বাংলাদেশ। জবাবে ৪৯.৩ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে ২৭৭ রান করে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় সফরকারীরা। শেষ ম্যাচে হারলেও সিরিজ জয়ের আনন্দ নিয়েই মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ।
অস্ট্রেলিয়ার জয়ের নায়ক কুপার কনোলি। পুরো রান তাড়ার দায়িত্ব প্রায় একাই কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। ১৩৪ বলে ১৩ চার ও ৬ ছক্কায় ১৪৯ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। এক প্রান্তে নিয়মিত উইকেট পড়লেও অন্য প্রান্তে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে দলকে জয়ের পথে এগিয়ে নেন তিনি। কভার ড্রাইভ, পুল শট কিংবা লং-অনের ওপর দিয়ে দৃষ্টিনন্দন ছক্কা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বোলারদের বিপক্ষে আধিপত্য বিস্তার করেন কনোলি।
তবে অস্ট্রেলিয়ার পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। নতুন বলে শুরুতেই জোড়া আঘাত হানেন শরিফুল ইসলাম। ২১ রান করা জশ ইংলিসকে ফিরিয়ে দেওয়ার পর একই ওভারে ম্যাট রেনশকে বোল্ড করে দেন তিনি। ৪০ রানে ২ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় অস্ট্রেলিয়া।
এরপর অ্যালেক্স ক্যারিকে ফেরান তাসকিন আহমেদ। তখন কনোলির সঙ্গে মার্নাস লাবুশেনের ৬৪ রানের জুটি অস্ট্রেলিয়াকে কিছুটা স্বস্তি দেয়। তবে ২৯ রান করা লাবুশেনকে নুরুল হাসানের দুর্দান্ত ক্যাচে ফিরিয়ে দিয়ে আবারও বাংলাদেশকে ম্যাচে ফেরান শরিফুল।
আরও পড়ুনঃ মরক্কোর তাণ্ডবে কাঁপল ব্রাজিল, সমতায় বাঁচল সেলেসাওরা
কনোলি অবশ্য নিজের কাজ চালিয়ে যান অবিচলভাবে। ৫১ বলে ফিফটি পূরণের পর ৮৭ বলে তুলে নেন ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি। তাঁর ব্যাটিংয়ে মুগ্ধ হয়ে মিরপুরের দর্শকরাও করতালি দিয়ে স্বীকৃতি জানান। অন্যদিকে ক্যামেরন গ্রিন ২৭ রান করে মেহেদী হাসান মিরাজের শিকার হলেও কনোলির দৃঢ়তায় জয়ের আশা জিইয়ে রাখে অস্ট্রেলিয়া।
শেষ ১০ ওভারে ম্যাচ পুরোপুরি সফরকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছিল। তাসকিন আহমেদের এক ওভারে টানা তিন ছক্কা হাঁকিয়ে ব্যবধান আরও কমিয়ে আনেন কনোলি। অলিভার পিকের ২৭ রানের কার্যকর ইনিংসও অস্ট্রেলিয়াকে এগিয়ে দেয়। একপর্যায়ে তাদের প্রয়োজন ছিল মাত্র ৩০ বলে ৯ রান।
সেখান থেকেই নাটকীয়ভাবে ম্যাচে ফিরে আসে বাংলাদেশ। ৪৬তম ওভারে শরিফুল পরপর দুই বলে অলিভার পিক ও জেভিয়ার বার্টলেটকে ফিরিয়ে দিয়ে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন। পরে বেন ডোয়ারশুইসকেও আউট করে ৬ উইকেটের কীর্তি গড়েন এই বাঁহাতি পেসার। ১০ ওভারে ১ মেডেনসহ ৪৮ রান দিয়ে ৬ উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ারসেরা বোলিং করেন তিনি।
ম্যাচের শেষদিকে কনোলিকে স্ট্রাইক থেকে দূরে রাখার কৌশল কিছুটা বিপাকে ফেলে অস্ট্রেলিয়াকে। একের পর এক উইকেট পড়তে থাকে, বাড়তে থাকে উত্তেজনা। ৪৯তম ওভারে মোস্তাফিজুর রহমানের বলে ১৪৯ রানে বোল্ড হয়ে ফেরেন কনোলি। তখন আবারও জয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে বাংলাদেশ।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। শেষ উইকেটে অ্যাডাম জাম্পা ও রাইলি মেরেডিথ প্রয়োজনীয় রান তুলে নেন। তাসকিনের বলে কভারের ওপর দিয়ে চার মেরে অস্ট্রেলিয়াকে ১ উইকেটের জয় এনে দেন জাম্পা। হাতে তখনও ছিল ৩ বল।
এর আগে বাংলাদেশের ইনিংসের শুরুটাও ছিল চ্যালেঞ্জিং। ইনিংসের চতুর্থ বলেই ২ রান করে সাজঘরে ফেরেন সৌম্য সরকার। তানজিদ হাসান ১৯ ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ২৪ রান করে আউট হলে ৬১ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় স্বাগতিকরা।
সেই ধাক্কা সামাল দেন লিটন দাস ও তাওহিদ হৃদয়। ইনিংসের মাঝপথে ক্র্যাম্পের কারণে মাঠ ছাড়লেও পরে ফিরে এসে ৭৮ বলে অপরাজিত ৫৮ রান করেন লিটন। তাঁর অনুপস্থিতিতে কিছু সময় উইকেটকিপিংয়ের দায়িত্ব পালন করেন নুরুল হাসান।
বাংলাদেশের ইনিংসের ভিত্তি গড়ে দেন তাওহিদ হৃদয়। ৮৮ বলে ৮ চার মেরে ৮৩ রানের দারুণ ইনিংস খেলেন তিনি। শেষদিকে মোসাদ্দেক হোসেনের ৫১ বলে অপরাজিত ৫৬ রানের কার্যকর ইনিংস বাংলাদেশকে লড়াই করার মতো সংগ্রহ এনে দেয়। হৃদয় ও মোসাদ্দেকের দায়িত্বশীল ব্যাটিং না থাকলে ২৭৪ রানের পুঁজি গড়া কঠিন হয়ে যেত।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে জেভিয়ার বার্টলেট ও ম্যাট রেনশ দুটি করে উইকেট নেন। একটি উইকেট শিকার করেন বেন ডোয়ারশুইস।
ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতেছেন কুপার কনোলি। আর পুরো সিরিজে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে সিরিজসেরা হয়েছেন বাংলাদেশের মোসাদ্দেক হোসেন।
হোয়াইটওয়াশের সুযোগ হাতছাড়া হলেও অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জয় বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন। আর মিরপুরের এই রোমাঞ্চকর ম্যাচ স্মরণীয় হয়ে থাকবে দুই তরুণ ক্রিকেটারের লড়াইয়ের জন্য—ব্যাট হাতে কুপার কনোলি এবং বল হাতে শরিফুল ইসলাম।

