বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮৬ জনকে ‘পূর্বে মিয়ানমারে বসবাসকারী ব্যক্তি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে মিয়ানমার। জাতীয় সংসদে এ তথ্য জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
বুধবার (১৭ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের নবম দিনে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রিত বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ৮৯ হাজার ২১৩ জন।
আরও পড়ুন: বর্ষা শেষে ভোটের প্রস্তুতি, সরকারের লক্ষ্য এক বছরে সব নির্বাচন
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার এ পর্যন্ত ছয় ধাপে ৮ লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমার সরকারের কাছে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৫০৩ জনের তথ্য যাচাই সম্পন্ন করেছে মিয়ানমার। যাচাইকৃতদের মধ্যে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮৬ জনকে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পূর্বে মিয়ানমারে বসবাসকারী ব্যক্তি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ড. খলিলুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘদিনের একটি জটিল মানবিক সমস্যা। ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার মুখে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন দফায় সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়ে আরও রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গে তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টিকে আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে ব্যাপক কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশ সফর করেন এবং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। এছাড়া রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান নিয়ে দেশি-বিদেশি অংশীজনদের অংশগ্রহণে বিশেষ সম্মেলন ও বৈশ্বিক পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: সিন্ডিকেট নির্মূল ও সংসদীয় টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব বিরোধীদলীয় নেতার
মন্ত্রী আরও জানান, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য বাংলাদেশ নিরাপদ, স্বেচ্ছা ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দিচ্ছে। একই সঙ্গে তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির (আইআরসি) সহযোগিতায় এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৪০৯ জন রোহিঙ্গাকে বিভিন্ন উন্নত দেশে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এর মধ্যে আইওএমের মাধ্যমে ৫ হাজার ৭১২ জন এবং আইআরসির মাধ্যমে ৬৯৭ জন পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েছেন। শুধু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে ৩৩৬ জন রোহিঙ্গাকে কানাডা, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় পুনর্বাসন করা হয়েছে।
তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনই এই সংকটের একমাত্র সমাধান।
আরও পড়ুন: বাজেটে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকা, এনবিআরে বাড়তি চাপ
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি জানান, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার রোধে বিশেষ টাস্কফোর্স নিয়মিত যৌথ অভিযান পরিচালনা করছে। পাশাপাশি ক্যাম্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা জবাবদিহির আওতায় আনতে বিশেষ কার্যপদ্ধতি প্রণয়ন করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে ক্যাম্পে খুন, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২০২৩ সালে ৬৬টি খুনের ঘটনা ঘটলেও ২০২৪ সালে তা কমে ৪৯টিতে এবং ২০২৫ সালে ৩৫টিতে নেমে আসে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে খুনের ঘটনা ঘটেছে ৬টি।

