দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে নানা জটিলতায় আটকে থাকা চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (সিইআইজেড) প্রতিষ্ঠার সহায়ক অবকাঠামো প্রকল্প একনেকের অনুমোদন পায়নি। মঙ্গলবার (৯ জুন) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চার হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হলেও তা অনুমোদনের জন্য আরও আলোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটি উত্থাপন করা হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টি নিয়ে চীনা প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানিয়েছে, সেই আলোচনা শেষে প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
একনেক সভায় প্রকল্পটির সারসংক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি চীনা পক্ষের সঙ্গে আরও গভীরভাবে বিষয়টি পর্যালোচনার কথা জানান।
আরও পড়ুন: প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বৃদ্ধিতে বিরক্ত প্রধানমন্ত্রী, ব্যবস্থার নির্দেশ
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় প্রায় ৮০০ একর জমিতে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন গড়ে তোলা হচ্ছে। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় অঞ্চলটিকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সরকারের প্রত্যাশা, এটি ভবিষ্যতে দেশে চীনা বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হবে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) মধ্যে ২০১৪ সালে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সমঝোতা স্মারক সই হয়। ২০১৬ সালে ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলেও ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়ন কাঠামো এবং প্রশাসনিক জটিলতায় প্রকল্পটির অগ্রগতি দীর্ঘদিন থমকে ছিল।
প্রাথমিকভাবে ডেভেলপার হিসেবে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে (সিএইচইসি) বিবেচনা করা হলেও চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়ায় কাজ এগোয়নি। পরে ২০২২ সালে চীন সরকারের মনোনয়নে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি) নতুন ডেভেলপার হিসেবে দায়িত্ব পায়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে বেজা।
একনেকে উপস্থাপিত পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী, প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। মোট ব্যয় ধরা হয়েছে চার হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন এক হাজার ৭২২ কোটি টাকা এবং চীনের প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (পিবিসি) ঋণ থেকে দুই হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা পাওয়া যাবে।
আরও পড়ুন: সব কিছুকে ইসলাম বানাবেন না, জামায়াতকে সালাউদ্দিন আহমদ
প্রকল্পের আওতায় জেটি লিংক সড়ক, সেতু, চার লেন সড়ক, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার, বহুমুখী জেটি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ অবকাঠামো, ট্রান্সমিশন লাইন, পানি সংরক্ষণাগার এবং প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হবে।
প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ডেভেলপার চুক্তি চূড়ান্ত হলেই অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে। সম্প্রতি বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, চীনা পক্ষের সঙ্গে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং প্রকল্পটিকে উভয় দেশই অগ্রাধিকারভুক্ত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করছে।
সরকারের আশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অন্তত এক লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং বস্ত্র, ওষুধ, হালকা প্রকৌশলসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী খাতে চীনা বিনিয়োগ বাড়বে।

