চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের প্রায় এক দশক পর চট্টগ্রামের আনোয়ারায় গড়ে ওঠা চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (সিইআইজেড) বাস্তবায়নে নতুন গতি আসতে যাচ্ছে। প্রকল্পটির জন্য ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার সহায়ক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রস্তাব আগামীকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন করা হতে পারে।
সচিবালয়ে অনুষ্ঠিতব্য একনেক সভায় সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে সিইআইজেডের জন্য প্রয়োজনীয় সড়ক, জেটি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। পরিকল্পনা কমিশনের একটি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রস্তাবিত অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে সংযোগ সড়ক, বহুমুখী জেটি, জলাধার, গ্যাস নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, গ্যাস সঞ্চালন লাইন, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, শিল্প বর্জ্য ও দূষিত পানি শোধনাগার এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র। কর্ণফুলী টানেলের নিকটবর্তী আনোয়ারায় অবস্থিত এ অর্থনৈতিক অঞ্চল দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হবে।
আরও পড়ুন: একনেকে উঠছে ১৩ প্রকল্প
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) বাস্তবায়নাধীন পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের সূচনা হয় ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর। ওই সময় বাংলাদেশ সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। একই সফরে বাংলাদেশ ও চীন ‘বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা সহযোগিতা জোরদারকরণ’ শীর্ষক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। পরে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য সরকার প্রায় ৮০০ একর জমি অধিগ্রহণ করে।
তবে ব্যাপক আলোচনার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও গত এক দশকে প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ছিল সীমিত। ২০২৩ সালে সরকার বহিঃস্থ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেয়।
বেজা চলতি বছরের ৬ মে প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে উপস্থাপন করে। কমিশন প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে বিভিন্ন অসঙ্গতি চিহ্নিত করে সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠায়। এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টে জমা দেওয়া ৩ হাজার ৮৫৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকার একটি সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবও নির্ধারিত নির্দেশনা অনুসরণ না করায় বাতিল হয়েছিল।
পরবর্তীতে ২১ মে একটি পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়। নতুন প্রস্তাবে মোট ব্যয় আগের খসড়ার তুলনায় ১৩৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা বৃদ্ধি পায়। গত ২ জুন প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি প্রস্তাবটি অনুমোদন করে, ফলে একনেকে উপস্থাপনের পথ সুগম হয়।
আরও পড়ুন: মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.৪২ শতাংশ, ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ
সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্প ব্যয়ের ৪১ দশমিক ১১ শতাংশ বহন করবে বাংলাদেশ সরকার এবং ৫৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ অর্থায়ন আসবে বৈদেশিক ঋণ থেকে। প্রকল্প সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, অগ্রাধিকারভিত্তিক ক্রেতা ঋণ কর্মসূচির আওতায় ২৬০ দশমিক ২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ঋণের শর্ত অনুযায়ী মোট অর্থায়নের ৮৫ শতাংশ দেবে চীন এবং বাকি ১৫ শতাংশ দেশীয় উৎস থেকে জোগান দিতে হবে। এছাড়া ঋণ সহায়তায় বাস্তবায়িত অংশগুলো চীন সরকারের মনোনীত ঠিকাদার বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রস্তাবিত অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি সংযোগ সড়ক, ৩৩০ মিটার দীর্ঘ সেতু, ১ হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ সংযোগ সড়ক, ২০ হাজার ৩০৪ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার জলাধার, দৈনিক ৪ দশমিক ২৪ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার গ্যাস নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, ২ কিলোমিটার গ্যাস সঞ্চালন লাইন, দৈনিক ২৫ মিলিয়ন লিটার সক্ষমতার বর্জ্য পানি শোধনাগার, ১ দশমিক ২ কিলোমিটার নিষ্কাশন পাইপলাইন, দৈনিক ৬০ টন সক্ষমতার কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র, ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, দুটি ৩৩/১১ কিলোভোল্ট বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, ২০ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন এবং ১২ কিলোমিটার সীমানা প্রাচীর।

