জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে ফ্যাসিবাদী সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটিতে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কারণে সৃষ্ট গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান।
সংকটময় এই সময়ে বিরোধী দলগুলোর আয়োজিত লং মার্চ কর্মসূচির কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণের দুর্ভোগকে কাজে লাগিয়ে উসকানি না দিয়ে সংকট উত্তরণে সরকারের পাশে থাকা উচিত। লং মার্চ দিয়ে সংকট সমাধান হলে সরকারি দলই সবার আগে লং মার্চ করত। এ সময় বিরোধী দলকেও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করে জাতীয় সংসদকে সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
একই সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুতের স্থায়ী সমাধানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি বিএনপি সরকারের অতীত সাফল্য ও সংকট মোকাবিলার নজির তুলে ধরে বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত সামলে ওঠার দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
আরও পড়ুন: দূষিত শহরের তালিকায় ৯ নম্বরে ঢাকা, শীর্ষে লাহোর
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে দেওয়া সমাপনী বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যের শুরুতে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং দুই বছর আগে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, একটি ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষ হতে যাচ্ছে। অধিবেশনটি সংক্ষিপ্ত হলেও দেশ ও জাতির বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে উভয় পক্ষ কার্যকর আলোচনা করেছে।
সংসদের প্রতিটি আলোচনা সম্পূর্ণ অর্থবহ হয়েছে—এমন দাবি না করলেও সংসদকে দেশের সব আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
সব সংসদ সদস্যের সদিচ্ছার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উভয় পক্ষই দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাজ করার যে আন্তরিক চেষ্টা চালিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। ২০২৪ সালের আন্দোলন পর্যন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের স্বপ্ন পূরণ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
রাষ্ট্র পরিচালনার পেছনের প্রেক্ষাপট ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের পক্ষে রায় দিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছে। গণতান্ত্রিক ধারায় বিরোধী দলও সরকারের অংশ—এই বিশ্বাস থেকে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে জনকল্যাণে কাজ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন তিনি।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানায় বিভিন্ন গ্রেডে ১৪২ পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন ৬ অক্টোবর পর্যন্ত
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিল্পকারখানা, শিক্ষা ও ব্যাংকিং খাতসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে দুর্নীতির পাহাড় জমেছিল, যা বিরোধী দল ও গণমাধ্যমসহ দেশবাসীর সবার জানা।
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এসব সমস্যাকে কোনো অজুহাত হিসেবে না দাঁড় করিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলেও সংসদকে আশ্বস্ত করেন তিনি।
সাম্প্রতিক তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংকট হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী সরকার দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনের কোনো চেষ্টাই করেনি। এমনকি বঙ্গোপসাগরে প্রতিবেশী দেশগুলো যখন গ্যাস আহরণ করছিল, তখন এক অদৃশ্য ইশারায় বাংলাদেশের অংশে গ্যাসকূপ খনন থেকে বিরত থাকা হয়, যাতে বিশেষ কোনো দেশ লাভবান হতে পারে।
পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর দেশ পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু বর্তমান সরকার গঠনের ১০ থেকে ১২ দিন পরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হয়, যা তেল-গ্যাস আমদানিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এর পাশাপাশি দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) একটিতে বৈদ্যুতিক শকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। এতে টার্মিনালটি পুরোপুরি বিকল হয়ে গেলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করে।

