মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের জিপিএ-৫ পাওয়ার পর ট্যাব দেওয়ার মতো উদ্যোগে অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হলে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের খাতা-কলমসহ মৌলিক শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়াও সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত একটি ডিসেমিনেশন ওয়ার্কশপে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন ইউনিসেফের শিক্ষা বিশেষজ্ঞ জয় মিলান মালের। গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
আরও পড়ুন: এসএসসির খাতা দেখায় গাফিলতি করা শিক্ষকদের জবাবদিহির আওতায় আসছেন: শিক্ষামন্ত্রী
প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের টিচিং অ্যান্ড লার্নিং ম্যাটেরিয়ালসের ব্যয় তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ বলেন, একজন শিক্ষার্থীর জন্য পেন্সিল, খাতা, ড্রয়িং খাতা, রুলার, রাবার, শার্পনার এবং পেন্সিল বক্স বা কালার পেন্সিল এই সাতটি মৌলিক উপকরণ প্রয়োজন। হিসাব করলে একজন শিক্ষার্থীর পুরো বছরের টিচিং অ্যান্ড লার্নিং এক্সপেন্স ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকার মধ্যে হতে পারে।
তিনি বলেন, টেক্সটবুক তো আমি দিয়ে দিচ্ছি। সামনে ইউনিফর্ম আমি দিয়ে দিচ্ছি। সো, এই যে টিচিং অ্যান্ড লার্নিং মেটেরিয়াল, এটা মোটামুটি আপনি এক জায়গায় বলতে পারেন ৫০০-৫৫০ টাকার ভিতরে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, স্কুলের জন্য হোয়াইটবোর্ড, ব্ল্যাকবোর্ড, চক, কলম এবং শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় কলম-কাগজসহ অন্যান্য টিচিং-লার্নিং সামগ্রীর হিসাব করলে শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত বিবেচনায় পুরো ফান্ড ৬৫০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার মধ্যে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব।
আরও পড়ুন: ২০২৭ সালের মধ্যে পেপারলেস হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়: উপাচার্য
মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের ল্যাপটপ দেওয়ার সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিক্ষা উপকরণের তুলনা তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘মাধ্যমিকে এখন যারা জিপিএ-৫ পেয়েছে, তাদের কোটি টাকা বেশি দিয়ে ট্যাব দিচ্ছে। এই ট্যাবটা নট নেসেসারি খুব প্রয়োজন, এবং আমি সাধুবাদ জানাই যারা কাজটা করছেন, এটাকে নিন্দা করতে বলছি না। কিন্তু যেটা অ্যাবসোলিউট নেসেসারি আইটেম না ওই শিক্ষার্থীর পরের শিক্ষার জন্য, কিন্তু খাতা-কলম-ইরেজার-শার্পনার অ্যাবসোলিউট নেসেসারি আইটেম আবার প্রাথমিক শিক্ষার্থীর শিক্ষার জন্য।’
তিনি বলেন, ‘উনারা যদি ৬০০ কোটি দিতে পারেন, আমাদের ৬০০ দেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত, বাধ্য না হওয়া উচিত? এটা বলে আমি মনে করি।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় স্লিপ ফান্ডের মাধ্যমে টিচিং অ্যান্ড লার্নিং ম্যাটেরিয়ালসের যে ব্যয় করা হয়, প্রয়োজনীয় এসব উপকরণ সরকার চাইলে আলাদাভাবে সরবরাহ করতে পারে। এভাবে করলে এ খাতে স্লিপ ফান্ডের প্রয়োজনীয়তাও কমে আসতে পারে।
স্লিপ ফান্ডের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি বলেন, স্কুলকে আগে নিজের পকেট থেকে খরচ করে পরে সরকারের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার ব্যবস্থা কার্যকর নয়। অর্থ আত্মসাতের আশঙ্কা থাকলেও এর সমাধান হিসেবে অগ্রিম অর্থ না দেওয়ার পরিবর্তে জবাবদিহি ও মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
আরও পড়ুন: একাদশে ভর্তিতে প্রায় ১০ লাখ আবেদন, ফল ১৬ সেপ্টেম্বর
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হেডটিচারকে পুরো স্কুলের নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে স্কুলের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী সংখ্যা, ভবনের বয়স, কক্ষ সংখ্যা ও অন্যান্য বাস্তব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে পিপিআরসির পক্ষ থেকে স্লিপ ফান্ড ও স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান নিয়ে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এসব সুপারিশের মধ্যে পাঁচটিকেই গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবায়নযোগ্য বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, পিডিইপি-৪ শেষ হওয়ার পর গত দুই মাস ধরে স্লিপ ফান্ড না থাকার কারণে বিভিন্ন পর্যায়ে বিড়ম্বনা তৈরি হয়েছে। পিডিইপি-৫ এখনো অনুমোদিত না হওয়ায় এই অর্থ আটকে থাকার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
প্রাথমিক শিক্ষায় সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ‘ইকুইটি-বেসড’ বা প্রয়োজনভিত্তিক বরাদ্দের ওপরও গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সরকারের সম্পদ সীমিত হওয়ায় যার আর্থিক প্রয়োজন বেশি, সরকারি সহায়তার ক্ষেত্রে তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, ‘আমাদের রিসোর্স লিমিটেড।’ ভালো করছে এমন স্কুলকে উৎসাহিত করার প্রয়োজন থাকলেও সরকারি অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত আর্থিক প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: দুর্গাপূজায় কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কতদিন ছুটি, জেনে নিন বিস্তারিত
অনুষ্ঠানে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, স্লিপ ফান্ডের ব্যবস্থাপনা, স্কুল পর্যায়ে জবাবদিহি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কমিউনিটি ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা এবং মনিটরিং ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ ও সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিক্ষা বিভাগের প্রধান দীপা শংকরসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

