জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের কারণে উন্নত দেশগুলোতে চাকরি হারানোর ঝুঁকি উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে সংস্থাটি বলেছে, স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো যদি বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, দক্ষ জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় দ্রুত বিনিয়োগ করতে পারে, তাহলে এআইয়ের সহায়তায় আগামী এক দশকেই এমন অগ্রগতি সম্ভব, যা স্বাভাবিকভাবে অর্জন করতে প্রায় এক শতাব্দী সময় লাগতে পারে।
বৃহস্পতিবার (৪ আগস্ট) ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ফ্ল্যাগশিপ প্রকাশনা ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৪: দ্য প্রমিজ অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’-এ এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নত দেশগুলোতে ১৪ দশমিক ২ শতাংশ চাকরি এআইয়ের কারণে ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিপরীতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই হার মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নয়নশীল অর্থনীতির অন্তত ১৬ দশমিক ২ শতাংশ কর্মসংস্থানে উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে, যা উন্নত দেশগুলোর ১৮ দশমিক ৭ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এআইয়ের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা শ্রমিকের কাজ কেড়ে নেওয়া নয়, বরং তাদের সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে দেওয়া।
আরও পড়ুন: ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে চাকরি, আবেদন ২০ আগস্ট পর্যন্ত
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল বলেন, এআই উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য নতুন এক ‘লাইফলাইন’। এর সুফল পেতে বড় এআই মডেল বা ব্যয়বহুল ডেটা সেন্টার তৈরির প্রয়োজন নেই। বরং কম খরচের এআই প্রযুক্তিকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে ব্যবহার করে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি সম্প্রসারণ ও বিচারসহ নানা সেবা কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। তবে এ জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, কারণ বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেটের মতো আগের প্রযুক্তির তুলনায় এআই অনেক দ্রুত বিস্তার লাভ করছে এবং এটি স্থানীয় প্রেক্ষাপটের ওপর বেশি নির্ভরশীল।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে এটিই প্রথম বিস্তৃত মূল্যায়ন বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব দেশের সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে সেবাদান, তথ্য বিশ্লেষণ, পূর্বাভাস তৈরি এবং কাজের পরিধি বাড়াতে এআই ব্যবহার শুরু করেছে। প্রশিক্ষিত জনবল ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ঘাটতি থাকা দেশগুলোতে চিকিৎসা, কৃষি, কর আদায়, সামাজিক নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা খাতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আরও পড়ুন: অফিসার নিয়োগ দেবে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, আবেদন ২৭ আগস্ট পর্যন্ত
বিশ্বব্যাংক বলছে, উন্নয়নশীল দেশগুলো বর্তমানে গত তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময় পার করছে। এআই চলতি দশকের শেষের আগেই এই স্থবিরতা কাটিয়ে দৃশ্যমান উন্নতির সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এ জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, ডেটা, দক্ষ জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ঘাটতি রয়েছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না থাকলে এআই ধনী ও দরিদ্র দেশের বৈষম্য আরও বাড়াতে পারে, বাজারের ক্ষমতা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত করতে পারে এবং নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক তিন ধাপের কৌশল প্রস্তাব করেছে। প্রথমত, বিদ্যমান এআই সরঞ্জাম গ্রহণ করা; দ্বিতীয়ত, সেগুলোকে স্থানীয় প্রয়োজনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া; এবং তৃতীয়ত, ধাপে ধাপে নিজস্ব এআই সক্ষমতা গড়ে তোলা। সংস্থাটির মতে, এভাবে এগোলে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হবে।
ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৪-এর পরিচালক গৌরব নায়ার বলেন, এই সুযোগ কাজে লাগানোর সময় খুবই সীমিত। যেসব উন্নয়নশীল দেশ এখনই বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট সংযোগ, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে বিনিয়োগ করবে, তারাই ভবিষ্যতে এআইকে নাগরিকদের কল্যাণে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারবে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অবকাঠামো উন্নয়নে মৌলিক বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, সাব-সাহারান আফ্রিকার গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশে এখনো নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ নেই এবং দুই-তৃতীয়াংশের বেশি বিদ্যালয়ে কার্যকর ইন্টারনেট সুবিধা নেই। এ ঘাটতি দূর করতে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ‘মিশন ৩০০’ উদ্যোগের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে ওই অঞ্চলের ৩০ কোটি মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনার লক্ষ্যে কাজ করছে।
আরও পড়ুন: জুনিয়র অফিসার নিয়োগ দেবে ব্যাংক এশিয়া, আবেদন ১২ আগস্ট পর্যন্ত
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশগুলোকে কম্পিউটিং সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় ভাষার ডেটা সহজলভ্য করতে হবে, যাতে স্থানীয় চাহিদাভিত্তিক এআই প্রযুক্তি তৈরি করা যায়। একই সঙ্গে নতুন উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগে বিনিয়োগ বাড়ানো, পরীক্ষামূলক প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক আরও বলেছে, এআই ব্যবহারে জনগণের আস্থা অর্জন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। যেখানে স্বেচ্ছাসেবী নীতিমালা যথেষ্ট নয়, সেখানে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। বিশেষ করে সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণে এআইয়ের পক্ষপাতদুষ্ট ব্যবহার বা নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হলে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

