‘এশিয়ার নোবেল’ হিসেবে পরিচিত র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পেয়েছেন বাংলাদেশের রুনা খান। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য দুই দশকের বেশি সময় ধরে কাজ এবং সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগে নেতৃত্ব দেওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। রুনা খান বেসরকারি সংস্থা ‘ফ্রেন্ডশিপ’–এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক।
আজ সোমবার ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় র্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন ২০২৬ সালের পুরস্কারজয়ীদের নাম ঘোষণা করেছে। রুনা খানের সঙ্গে এবার আরও দুজন এই পুরস্কার পেয়েছেন। তারা হলেন সিঙ্গাপুরের টমি কোহ ও মিয়ানমারের বো চি।
টমি কোহ সিঙ্গাপুরের কূটনীতিক, আইনজীবী, অধ্যাপক ও লেখক। বো চি মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক রাজনৈতিক বন্দী।
পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে এবার ৬৮তম র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছে। উৎসবের সমাপনী পর্বে আগামী ১৫ নভেম্বর ম্যানিলায় পুরস্কারজয়ীদের হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হবে।
আরও পড়ুনঃ রত্নগর্ভা মা অ্যাওয়ার্ড পেলেন ৩৫ মা
‘ফ্রেন্ডশিপ’–এর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দুই দশকের বেশি সময় ধরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সমন্বিত, সামগ্রিক ও স্থানীয় বাস্তবতাভিত্তিক উন্নয়ন সমাধান গড়ে তোলায় নেতৃত্ব, সাহস ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির স্বীকৃতি হিসেবে রুনা খানকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।
পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় রুনা খান বলেছেন, তিনি গভীর আনন্দ ও বিনয়ের সঙ্গে র্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করছেন। এই স্বীকৃতি একই সঙ্গে একটি বড় দায়িত্ব।
রুনা খান ২০০২ সালে ‘ফ্রেন্ডশিপ’ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ফ্রেন্ডশিপ একটি আন্তর্জাতিক সামাজিক উদ্দেশ্যভিত্তিক সংস্থা (এসপিও)।
প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য এমন একটি বিশ্ব গড়ে তোলা, যেখানে সবাই সমান সুযোগ নিয়ে মর্যাদা ও আশা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবেন। বিশেষ করে যাদের কাছে পৌঁছানো কঠিন এবং যাদের প্রয়োজনের বিষয়টি অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে, তাদের জন্য কাজ করে ফ্রেন্ডশিপ।
ফ্রেন্ডশিপ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা মোকাবিলা করে। যেসব জনগোষ্ঠীর জন্য তারা কাজ করে, তাদের স্বার্থকে সব সময় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
২০ বছরের বেশি সময় ধরে ফ্রেন্ডশিপের মূল লক্ষ্য প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়া, পরিবেশগত সংকট, চরম দারিদ্র্য, বৈষম্য ও অবিচারের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির এই লক্ষ্য এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রুনা খানের নেতৃত্বে ফ্রেন্ডশিপ দেশের প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন ধরনের সেবা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দেওয়াই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম লক্ষ্য।
র্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশনের ভাষ্য, ২০২৬ সালের পুরস্কারজয়ীদের এমন কাজের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে, যা র্যামন ম্যাগসাইসাইয়ের নেতৃত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিরস্থায়ী মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটায়।
এসব মূল্যবোধের মধ্যে রয়েছে অন্যের সেবায় নিয়োজিত থাকা। রয়েছে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য সুযোগ তৈরি করা। একই সঙ্গে মানুষকে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করাও এর অংশ।
র্যামন ম্যাগসাইসাই ছিলেন ফিলিপাইনের সপ্তম প্রেসিডেন্ট। তার নামে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ১৯৫৭ সালের ১৭ মার্চ এক মর্মান্তিক উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান।
একই বছর র্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৮ সালে এই পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়।
আরও পড়ুনঃ ‘গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’ সম্মাননা পাচ্ছেন খালেদা জিয়া
৩১ আগস্ট র্যামন ম্যাগসাইসাইয়ের জন্মদিন। আজ তার ১১৯তম জন্মবার্ষিকী। প্রতিবছর ৩১ আগস্ট তার জন্মদিনে ম্যানিলা থেকে এই পুরস্কারের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়।
ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর মোট ছয়টি শ্রেণিতে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার দেওয়া হতো। শ্রেণিগুলো হলো সরকারি সেবা, জনসেবা, সামাজিক নেতৃত্ব, সাংবাদিকতা-সাহিত্য-সৃজনশীল যোগাযোগকলা, শান্তি ও আন্তর্জাতিক বোঝাপড়া এবং উদীয়মান নেতৃত্ব।
২০০০ সাল থেকে উদীয়মান নেতৃত্ব শ্রেণিতে পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। ফোর্ড ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তায় এই শ্রেণির পুরস্কার চালু করা হয়েছিল।
তবে ২০০৯ সাল থেকে ‘উদীয়মান নেতৃত্ব’ ছাড়া আর কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে পুরস্কারটি সীমাবদ্ধ নেই।
রুনা খানের এই অর্জন বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পেয়েছে।
এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো রুনা খানের নাম। প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে দীর্ঘদিনের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া এই পুরস্কার তার পাশাপাশি বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়ন খাতের জন্যও বড় সম্মান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

