একসময় পেশাদার ফুটবলে একটি ধারণা প্রায় প্রতিষ্ঠিত ছিল—খেলোয়াড়রা ৩০-এর ঘর পেরোলেই তাদের ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় শুরু হয়ে যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়া, ঘন ঘন চোট এবং খেলার তীব্র চাপের কারণে বিশ্বের সেরা ফুটবলাররাও সাধারণত মধ্য ত্রিশের পর অবসরের দিকে এগিয়ে যেতেন।
কিন্তু সময় বদলেছে। বিশ্ব ফুটবলের দুই মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসি সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছেন। তারা দুজনই নিজেদের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের সঙ্গে আছেন ম্যানুয়েল নয়্যার, লুকা মদরিচ, গিয়ের্মো ওচোয়া এবং এদিন জেকোর মতো অভিজ্ঞ ফুটবলাররা। তারা দেখিয়ে দিচ্ছেন, আধুনিক ফুটবলে শীর্ষ পর্যায়ের ক্যারিয়ার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি দীর্ঘ হতে পারে।
বর্তমানে রোনালদোর বয়স ৪১ বছর। অন্যদিকে বিশ্বকাপ চলাকালেই ৩৯ বছরে পা দেবেন মেসি। বয়স বাড়লেও তারা এখনো বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ও জনপ্রিয় ক্রীড়াবিদদের মধ্যে রয়েছেন। বিষয়টি আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, এবারের বিশ্বকাপের অনেক তরুণ ফুটবলার তখনো জন্মই নেননি, যখন ২০০৬ সালে মেসি ও রোনালদো প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলেছিলেন।
জার্মান জাতীয় দলের সাবেক কোচ ইয়োয়াখিম ল্যোভ এই দুই কিংবদন্তির প্রশংসা করে বলেন, 'এই দুই খেলোয়াড় অসাধারণ। গত ২০ বা ৩০ বছরে ফুটবলকে তাদের মতো করে আর কেউ প্রভাবিত করতে পারেনি। এত শিরোপা, এত অর্জন এবং এত উচ্চাকাঙ্ক্ষা সত্যিই বিরল।'
তবে ল্যোভ এটাও স্বীকার করেছেন যে, মেসি ও রোনালদো আর তাদের ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ শারীরিক সক্ষমতায় নেই। তারপরও তারা যে এখনো কার্যকর ও প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলছেন, সেটিই আধুনিক ফুটবলের বড় পরিবর্তনের প্রমাণ।
ক্রীড়া চিকিৎসাবিদ অধ্যাপক হ্যান্স-গেয়র্গ প্রেডেলের মতে, বর্তমান সময়ের অনেক অভিজ্ঞ ফুটবলার প্রকৃত বয়সের তুলনায় জৈবিকভাবে অনেক বেশি তরুণ থাকেন। ক্রীড়া বিজ্ঞান, পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, পুনর্বাসন পদ্ধতি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার উন্নতি ফুটবলারদের ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আরও পড়ুনঃ বিশ্বকাপে কোন ম্যাচ থেকে নেইমারকে পাওয়া যাবে, জানালেন ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি
শুধু তাই নয়, ফুটবলার তৈরির প্রক্রিয়াতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক ফুটবল একাডেমিগুলো এখন তরুণ খেলোয়াড়দের শুধু কারিগরি দক্ষতাই শেখায় না; পাশাপাশি সঠিক খাদ্যাভ্যাস, শরীরের যত্ন, বিশ্রাম এবং চোট প্রতিরোধের কৌশলও শেখায়। ছোটবেলা থেকেই এসব অভ্যাস গড়ে ওঠায় একজন খেলোয়াড় আরও দীর্ঘ সময় পেশাদার ফুটবল খেলতে পারেন।
জার্মান জাতীয় দলের দীর্ঘদিনের চিকিৎসক টিম মেয়ার মনে করেন, এই পেশাদারিত্ব ফুটবলকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। তবে বয়সের প্রভাবকে পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না। তার মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খেলোয়াড়দের শরীরে দীর্ঘদিনের চাপ জমতে থাকে। ফলে জয়েন্ট, টেনডন ও লিগামেন্টে ক্ষয় বাড়ে এবং অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে চোট পাওয়ার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
অধ্যাপক প্রেডেলও একই মত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, সাধারণত ৩০ বছর বয়সের পর একজন খেলোয়াড়ের গতি, বিস্ফোরণশক্তি এবং ম্যাচের পর দ্রুত পুনরুদ্ধারের ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে।
তবে আধুনিক ফুটবলে অভিজ্ঞতা ও খেলার বুদ্ধিমত্তার গুরুত্ব আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। তাই বয়সী ফুটবলাররা শুধু শারীরিক শক্তির ওপর নির্ভর করেন না। তারা নিজেদের অবস্থান নির্বাচন, প্রতিপক্ষের গতিবিধি আগেভাগে বুঝতে পারা, কারিগরি দক্ষতা এবং দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে শারীরিক সীমাবদ্ধতা পুষিয়ে দেন।
মেসি ও রোনালদোর বর্তমান ক্লাব ফুটবলের পরিবেশও তাদের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। মেসি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলছেন। অন্যদিকে রোনালদো খেলছেন সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরের হয়ে। এই দুটি লিগ প্রতিযোগিতামূলক হলেও ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোর তুলনায় শারীরিক চাপ তুলনামূলক কম। ফলে বয়স বাড়লেও তারা নিজেদের ফিটনেস ধরে রেখে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলে যেতে পারছেন।
ফুটবলের এই নতুন বাস্তবতায় মেসি ও রোনালদো যেন একটি নতুন বার্তাই দিচ্ছেন—আধুনিক ফুটবলে ৪০ বছর এখন আর ক্যারিয়ারের শেষ নয়; অনেক ক্ষেত্রেই সেটি নতুন করে নিজেকে প্রমাণ করার আরেকটি অধ্যায়।

