অবশেষে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে বিদায় জানালেন লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। সোমবার (৩১ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি।
আর্জেন্টিনার হয়ে দীর্ঘ ২১ বছরের পথচলার ইতি টানলেন মেসি। এই সময়ে জাতীয় দলের হয়ে রেকর্ড ২০৭টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। গোল করেছেন ১২৫টি। দুই ক্ষেত্রেই আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সবার ওপরে মেসি।
নিজের ফেসবুক পেজে আজ সেই সিদ্ধান্ত জানান ৩৯ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। সেখানে তিনি লেখেন, ‘(বিশ্বকাপ) ফাইন্যালের পর এতদিন সময় যাওয়ার পর, অনেক ভেবেচিন্তে, আমি আপনাদের সকলকে জানাতে চাই যে আমি জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছি…।’
আরও পড়ুনঃ বল হাতে অনুশীলন নাহিদ রানা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে ফেরার আশায় বিসিবি
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির শেষ ম্যাচ ছিল ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। ফলে বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন পূরণ হয়নি মেসিদের। তবে পুরো টুর্নামেন্টে দারুণ পারফরম্যান্স করেছেন তিনি।
এর আগে ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে তৃতীয় বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন মেসি। ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে টাইব্রেকারে জিতে শিরোপা নিশ্চিত করেছিল আর্জেন্টিনা। ওই বিশ্বকাপে মেসি গোল ও নেতৃত্বে ছিলেন দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন।
২০২৬ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। এর ফলে বিশ্বকাপের ফাইনালে তিনবার খেলার অভিজ্ঞতা হলো মেসির। এর আগে ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালেও খেলেছিলেন তিনি। সেবার জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হেরে রানার্সআপ হয়েছিল আর্জেন্টিনা।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ দিকে এসে মেসির সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলো এসেছে একের পর এক। ২০২১ সালে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জিতেছিল আর্জেন্টিনা। এটিই ছিল মেসির জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় সিনিয়র আন্তর্জাতিক শিরোপা।
এর এক বছর পর ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে হারিয়ে ফাইনালিসিমা জেতে আর্জেন্টিনা। ওয়েম্বলিতে অনুষ্ঠিত ম্যাচে ৩-০ গোলে জয় পেয়েছিল দলটি। ওই ম্যাচেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল মেসির।
এরপর আসে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়। কাতারে মেসির নেতৃত্বে বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। ফাইনালে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপের শিরোপা পুনরুদ্ধার করে তারা।
২০২৪ সালেও আর্জেন্টিনার সাফল্যের অংশ ছিলেন মেসি। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকার ফাইনালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো এই প্রতিযোগিতার শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। ফলে জাতীয় দলের হয়ে মেসির সিনিয়র পর্যায়ের বড় শিরোপার সংখ্যা দাঁড়ায় চারটি—দুটি কোপা আমেরিকা, একটি ফাইনালিসিমা ও একটি বিশ্বকাপ।
আরও পড়ুনঃ ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে দল পেলেন মিরাজ
তবে জাতীয় দলের হয়ে মেসির সাফল্যের শুরু আরও আগে। ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জিতেছিলেন তিনি। এরপর ২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকে আর্জেন্টিনার হয়ে সোনার পদকও জেতেন।
মেসির জাতীয় দলের ক্যারিয়ারের শুরু অবশ্য সুখকর ছিল না। ২০০৫ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে মাঠে নামার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লাল কার্ড দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই হতাশাজনক শুরু পেছনে ফেলে পরবর্তী দুই দশকে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় তারকা হয়ে ওঠেন মেসি।
আর্জেন্টিনার হয়ে শুরুতে অবশ্য বড় শিরোপার দেখা পাননি মেসি। ২০০৭ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। এরপর ২০১৪ সালের বিশ্বকাপেও ফাইনালে হেরে যায় দলটি।
২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালেও ব্যর্থ হয় আর্জেন্টিনা। দুবারই চিলির কাছে টাইব্রেকারে হারতে হয় তাদের। ২০১৬ সালের পর হতাশা থেকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন মেসি। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই সিদ্ধান্ত বদলে আবার জাতীয় দলে ফেরেন তিনি।
এরপর বদলে যায় গল্প। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় সিনিয়র শিরোপা জেতেন মেসি। সেই সাফল্যের পর ২০২২ সালে ফাইনালিসিমা ও বিশ্বকাপ জয় করে আর্জেন্টিনা।
২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকা জিতে নেয় তারা। এরপর ২০২৬ বিশ্বকাপেও ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। শেষ পর্যন্ত শিরোপা না পেলেও টানা কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে দলকে শীর্ষ পর্যায়ে রাখার ক্ষেত্রে মেসির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় দলের হয়ে মেসির ব্যক্তিগত রেকর্ডও অসাধারণ। ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল করে তিনি আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলদাতা। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়ও তিনি।
বিশ্বকাপেও একাধিক রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন মেসি। ২০২৬ বিশ্বকাপে গোল করার মাধ্যমে বিশ্বকাপের ইতিহাসে তার মোট গোলের সংখ্যা ১৮-তে পৌঁছায়। এর আগে ২০২২ বিশ্বকাপেই তিনি একাধিক রেকর্ড গড়েছিলেন।
মেসির বিদায়ের সিদ্ধান্ত অবশ্য হঠাৎ করে আসেনি। ২০২৬ বিশ্বকাপের পর তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছিল। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া এর আগে বলেছিলেন, কখন অবসর নেবেন সেই সিদ্ধান্ত একমাত্র মেসিরই।
বিশ্বকাপের ফাইনালের পর মেসি অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনেও এই সময়টা তার জন্য কঠিন ছিল। চলতি মাসে তার বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যু হয়। এরপর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও ভাবতে হয়েছে তাকে।
জাতীয় দল থেকে মেসির বিদায় তাই আর্জেন্টিনার ফুটবলে একটি যুগের সমাপ্তি। ২০০৫ সালে যে তরুণ ফুটবলার জাতীয় দলে পা রেখেছিলেন, ২১ বছর পর তিনিই আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ও গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন হয়ে বিদায় নিচ্ছেন।
তার সময়ে আর্জেন্টিনা জিতেছে বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা ও ফাইনালিসিমা। ব্যক্তিগতভাবে তিনি গড়েছেন ম্যাচ ও গোলের রেকর্ড। জিতেছেন অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ ও অলিম্পিক সোনাও।
জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ ম্যাচে বিশ্বকাপ না জিতলেও মেসির উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন নেই। আর্জেন্টিনার হয়ে তার দীর্ঘ যাত্রা শেষ হয়েছে এক অসাধারণ অধ্যায়ের মাধ্যমে। এখন থেকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসিকে দেখা যাবে না। মাঠের বাইরে থেকে প্রিয় দলটির জন্যই গলা মেলাবেন ফুটবলের এই কিংবদন্তি।

