দীর্ঘদিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজনে বিভক্ত জর্ডানে যে কাজ রাজনীতি করতে পারেনি, সেই কাজ অনেকটাই করে দেখিয়েছে ফুটবল। ফিলিস্তিনি ও জর্ডানীয় পরিচয়ের মানুষের মধ্যে দূরত্ব, সংঘাত এবং অবিশ্বাসের ইতিহাস পেছনে ফেলে ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নেওয়া দেশটির জাতীয় ফুটবল দল আজ পরিণত হয়েছে ঐক্যের প্রতীকে। যে ফুটবল একসময় বিভেদের ভাষা ছিল, সেই ফুটবলই এখন জর্ডানের মানুষের জন্য একই পতাকার নিচে এক হওয়ার সবচেয়ে বড় মঞ্চ। খবর টিওয়াইসি স্পোর্টস।
জর্ডানের এই বাস্তবতা বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০১০ সালের ১০ ডিসেম্বরের এক শীতের রাতে। আম্মানের কিং আবদুল্লাহ দ্বিতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল দেশটির সবচেয়ে বড় ফুটবল দ্বৈরথ। সেই ম্যাচে আল-ওয়েহদাত ১-০ গোলে হারায় আল-ফাইসালিকে। খেলা শেষে আল-ওয়েহদাত সমর্থকদের আনন্দ-উল্লাসের মধ্যেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রতিপক্ষ সমর্থকদের একটি অংশ বোতল ও পাথর নিক্ষেপ শুরু করলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই উৎসবের পরিবেশ পরিণত হয় সহিংসতায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ নামলেও দর্শকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও হুড়োহুড়িতে অন্তত ২৫০ জন আহত হন। সেদিন ফুটবল মাঠে যা ঘটেছিল, তা ছিল শুধু একটি ম্যাচ-পরবর্তী সহিংসতা নয়; বরং জর্ডানের বহু বছরের সামাজিক বিভক্তির প্রকাশ।
আরও পড়ুনঃ বিশ্বকাপে চালু হওয়া যেসব নতুন নিয়ম না জানলে ভরকে যেতে পারেন আপনিও
এই বিভক্তির শেকড় দেশটির ইতিহাসে গভীরভাবে প্রোথিত। আল-ওয়েহদাত ক্লাবটির জন্ম হয়েছিল ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর আম্মানে গড়ে ওঠা একটি ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরে। সময়ের সঙ্গে ক্লাবটি ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত লাখো জর্ডানীয়ের পরিচয়, আবেগ এবং প্রতিনিধিত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে আল-ফাইসালি দীর্ঘদিন ধরে বেদুইন গোত্রভুক্ত জনগোষ্ঠী এবং জর্ডানের হাশেমি রাজতন্ত্রের সমর্থকদের প্রতিনিধিত্বকারী ক্লাব হিসেবে পরিচিত। দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতাও এখনো হাশেমি রাজপরিবারের হাতেই রয়েছে।
দুই ক্লাবের বৈরিতা আরও গভীর হয় ১৯৭০ সালের ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’-এর ঘটনার পর। সে সময় ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা (পিএলও) রাজা হুসেইন প্রথমকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু রাজকীয় বাহিনী সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। ওই সংঘাতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং জর্ডান রাষ্ট্র ও ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশের মধ্যে সম্পর্কের ওপর স্থায়ী প্রভাব পড়ে।
এরপর থেকে আল-ওয়েহদাত ও আল-ফাইসালির প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু ফুটবলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধীরে ধীরে দুটি ক্লাব জর্ডানের দুটি ভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। এমনকি অনেকের কাছে ফুটবল মাঠ ছিল নিজেদের পরিচয় ও মত প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম, কারণ দেশটিতে সরকারের সমালোচনার ক্ষেত্র আইনগতভাবে সীমিত।
২০১০ সালের সহিংসতার ঘটনা জর্ডানের ফুটবলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনলেও দুই পক্ষের বৈরিতা পুরোপুরি শেষ হয়নি। এখনো এই ম্যাচ দেশটির সবচেয়ে স্পর্শকাতর ক্রীড়া আয়োজনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
ঘটনার ১৬ বছর পরও ক্লাসিকো ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখা হয়। দর্শকসংখ্যা সীমিত করা, প্রবেশপথে কঠোর তল্লাশি এবং কখনো কখনো দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে ম্যাচ আয়োজনের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পাশাপাশি সমর্থকদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন ও সহিংসতা কমাতে বৈষম্যবিরোধী প্রচারণাও চালানো হচ্ছে নিয়মিত।
তবে সব বিভক্তির মাঝেও জর্ডানের জাতীয় ফুটবল দল এক ভিন্ন গল্প লিখেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নেওয়া দলটি এমন এক মঞ্চ তৈরি করেছে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে বিভক্ত দুই সম্প্রদায়ের মানুষ একই পতাকার নিচে দাঁড়াতে পারছেন।
বিশ্বকাপে জর্ডান খেলবে গ্রুপ ‘জে’-তে। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা, অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া। কিন্তু বিশ্বমঞ্চে জর্ডানের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো শুধু অংশগ্রহণ নয়। বরং এমন একটি জাতীয় দল গড়ে তোলা, যা বহু বছর ধরে বিভক্ত একটি দেশের মানুষের মধ্যে ঐক্যের অনুভূতি ফিরিয়ে এনেছে। ক্লাব ফুটবল যেখানে বিভেদের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, সেখানে জাতীয় দল আজ জর্ডানের মানুষের কাছে জাতীয় গর্ব, আশা এবং একতার প্রতীক।

