চলতি বছর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) আয়োজন না করার সিদ্ধান্তে অটল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। সবশেষ দুই আসরে আর্থিক লোকসানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এবার বিপিএল না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বোর্ড। তবে দীর্ঘ সময়ের জন্য লিগ বন্ধ রাখতে চায় না বিসিবি। নতুন কাঠামো তৈরি করে আরও গুছিয়ে বিপিএল মাঠে ফেরানোর পরিকল্পনা করছে তারা।
আরও পড়ুনঃ ফুটবল কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার ২ আর্জেন্টাইন নির্বাহীর
বিসিবির এই পরিকল্পনার সঙ্গে একমত হয়েছে সবশেষ আসরের তিন ফ্র্যাঞ্চাইজিও। শনিবার (২৯ আগস্ট) বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের সঙ্গে তিন ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকপক্ষের বৈঠকে বিপিএলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে রাজশাহী ওয়ারিয়র্স, ঢাকা ক্যাপিটালস ও রংপুর রাইডার্সের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে তিন ফ্র্যাঞ্চাইজির পক্ষ থেকেই বিপিএল আয়োজনের আগে নতুন মডেল তৈরির পক্ষে মত দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, আগের মতো তাড়াহুড়া করে আয়োজন না করে সময় নিয়ে একটি কার্যকর মডেল তৈরি করা প্রয়োজন।
কেন এবার বিপিএল হচ্ছে না
সবশেষ দুই আসরে বিপিএল আয়োজন করে আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছে বিসিবি। এর পাশাপাশি ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর সঙ্গে আর্থিক ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হয়েছে।
এ কারণে চলতি বছর বিপিএল আয়োজন না করার সিদ্ধান্ত আগেই জানিয়েছিল বিসিবি। এখন লিগের কাঠামো নতুন করে সাজানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে বোর্ড।
নতুন মডেলে বিসিবি, ফ্র্যাঞ্চাইজি ও ক্রিকেটার—সব পক্ষের স্বার্থ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও দায়বদ্ধতার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
রংপুর রাইডার্সের বক্তব্য
শনিবারের বৈঠকে অংশ নেয় সবশেষ আসরের তিন ফ্র্যাঞ্চাইজি। বৈঠক শেষে রংপুর রাইডার্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইসতিয়াক সাদেক বিপিএলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন।
তিনি বলেন, 'বাজারের পরিস্থিতি দিনকে দিন এত খারাপ হচ্ছে যে এটা আরও বেশি খারাপই হবে। সুতরাং শুধু নামমাত্র বিপিএল করে প্রতিশ্রুতি দিলাম ৩০ লাখ টাকা দেব, কিন্তু খেলোয়াড়কে আমি শেষ পর্যন্ত ১৫ লাখ টাকা দিচ্ছি না, ফোন ধরছি না, হারিয়ে যাচ্ছি- এর চেয়ে বরং একটু সময় নিয়ে ভালো কোনো একটা মডেলে করাটাই ভালো।'
বিপিএলে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর আর্থিক সংকটের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ইসতিয়াক সাদেক বলেন, 'জানুয়ারি মাস পার হয়ে আজ প্রায় ৭/৮ মাস চলছে, আমাদের এখনো কিছু স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়ের পারিশ্রমিক দেওয়া বাকি। কারণ, আমাদের সঙ্গে যেসব পৃষ্ঠপোষক চুক্তি করেছিল, তারা তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পারিশ্রমিকগুলো পরিশোধ করে না।'
তার বক্তব্যে বিপিএলের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর ওপর থাকা আর্থিক চাপের কথাও স্পষ্ট হয়েছে।
নতুন মডেল চায় ঢাকা ক্যাপিটালস
বিপিএলের নতুন কাঠামোর পক্ষে মত দিয়েছে ঢাকা ক্যাপিটালসও। ফ্র্যাঞ্চাইজিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আতিক ফাহাদ জানিয়েছেন, নতুন মডেল তৈরি করতে বিসিবিকে সময় দিতে রাজি তারা।
তিনি বলেন, 'বিসিবি বলেছে, বিপিএলের নতুন মডেল তৈরি করে কমপক্ষে চার-পাঁচ মাস আমাদের সময় দেওয়া হবে। যাতে করে আমরা উনাদের ক্রাইটেরিয়া ফুল ফিল করতে পারি। শেষ দুই বছরে যেভাবে বিপিএল হয়েছে, এবারও সেভাবে হলে আমরা থাকবো না। কারণ, গালি আমরা বেশি খাই। বিপিএলে নতুন মডেল এলে আমরা থাকতে চাইবো। বিসিবি প্রেসিডেন্ট বলেছেন বিপিএল অবশ্যই হবে, তবে সময় চাচ্ছেন। বিপিএলের মান বাড়াতে তামিম (ভাই) ভালো একটা মডেল করতে চাচ্ছেন। ওনাকে আমরা সময় দিতে রাজি।'
ঢাকা ক্যাপিটালসের এই বক্তব্যে পরিষ্কার হয়েছে, পুরোনো কাঠামোয় বিপিএল আয়োজন হলে তারা অংশ নিতে আগ্রহী নয়। তবে নতুন ও কার্যকর মডেল তৈরি হলে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি লিগে থাকতে চায়।
রাজশাহী ওয়ারিয়র্সও চায় নতুন মডেল
সবশেষ আসরের চ্যাম্পিয়ন রাজশাহী ওয়ারিয়র্সও বিপিএলের ধারাবাহিকতা চায়। তবে একই সঙ্গে আগের সমস্যাগুলোর সমাধান করার পক্ষে তারা।
রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোকছেদুল কামাল বাবু বলেন, 'অবশ্যই আমরা মাঠে বিপিএল চাই। লিগের ধারাবাহিকতা থাকা দরকার। তবে যে সমস্যাগুলো ছিল, সেগুলোর সমাধান করাও দরকার। একটা ভালো মডেল তৈরি করা দরকার। যাতে করে, বিসিবি-ফ্ল্যাঞ্জাইজি-খেলোয়াড় সবার যেন লাভ হয়।'
ক্রিকেটারদের সঙ্গেও বৈঠক তামিমের
বিপিএল নিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর এবার ক্রিকেটারদের সঙ্গেও বৈঠকে বসবেন বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল।
আগামী রবিবার (৩০ আগস্ট) ক্রিকেটারদের সঙ্গে এই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের পাশাপাশি নিয়মিত ঘরোয়া ক্রিকেটে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়রাও উপস্থিত থাকবেন।
আরও পড়ুনঃ সান্তোসকে ফিফার জরিমানার হাত থেকে বাঁচালেন নেইমার
ক্রিকেটারদের সংগঠন ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (কোয়াব) প্রতিনিধিরাও বৈঠকে অংশ নেবেন।
বৈঠকে ক্রিকেটারদের দাবি-দাওয়া এবং ঘরোয়া ক্রিকেটের সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি বিপিএলের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
সময় নিয়ে বিপিএল ফেরানোর পরিকল্পনা
সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিপিএলের জন্য নতুন একটি কাঠামো তৈরি করতে চায় বিসিবি। তাড়াহুড়া করে পুরোনো কাঠামোয় লিগ আয়োজন না করে সময় নিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে যেতে চায় বোর্ড।
ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর বক্তব্যেও একই ধরনের মত উঠে এসেছে। তারা বিপিএল চালু রাখার পক্ষে। তবে আগের সমস্যাগুলো রেখে নতুন আসর আয়োজন করতে চায় না।
ফলে চলতি বছর বিপিএল না হলেও ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও টেকসই কাঠামোয় লিগটি মাঠে ফেরানোর লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে বিসিবি।

