বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের জন্য বৈধ ভিসা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারেননি সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতান। মায়ামি বিমানবন্দর থেকে তাকে ফেরত পাঠানো হয় ইস্তাম্বুলে। ফলে ইতিহাস গড়ার সুযোগ হারালেও দেশে ফিরে বীরের সংবর্ধনা পেয়েছেন তিনি। মোগাদিশুর বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে হাজির হন সরকারি কর্মকর্তা ও শত শত সমর্থক।
বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের জন্য ওমর আরতানের নির্বাচিত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই সোমালিয়াজুড়ে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। কারণ তিনিই হতে যাচ্ছিলেন বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম সোমালি রেফারি। আফ্রিকা থেকে নির্বাচিত সাতজন রেফারির একজনও ছিলেন তিনি। অনেকের কাছে এটি ছিল দেশের ফুটবল ইতিহাসে নতুন এক মাইলফলক।
তবে শুরু থেকেই শঙ্কা ছিল। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে বিশ্বকাপ থেকে নিষিদ্ধ করার হুমকি দিয়েছিলেন, যদিও পরে ফিফা হস্তক্ষেপ করেছিল। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিও সতর্ক করেছিলেন যে, আইসিইর (ICE) তৎপরতা বৃদ্ধি বিশ্বকাপের চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তার বাবা মাহমুদ মামদানি সম্প্রতি জানিয়েছিলেন, একসময় তিনি প্রায় সোমালিয়ার নাগরিকত্ব নিতে যাচ্ছিলেন।
ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে সোমালিয়া ও সোমালি-আমেরিকানদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সোমালিয়া বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। ফলে আরতান যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।
বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে কয়েক দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরতান লিখেছিলেন, ‘মায়ামির পথে।’ তখন তিনি ইস্তাম্বুলে ট্রানজিটে ছিলেন। কিন্তু মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরই তার সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত কর্মকর্তারা তাকে প্রবেশের অনুমতি না দিয়ে আবার ইস্তাম্বুলে ফেরত পাঠান। অথচ তার বৈধ ভিসা ছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরের অংশগ্রহণকারীরা সাধারণত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি পান। তবু সীমান্ত কর্মকর্তারা ‘যাচাই-সংক্রান্ত উদ্বেগ’-এর কথা বলে তাকে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করেন।
বুধবার মোগাদিশুর আদেন আদ্দে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফিরে আসার পর আরতানকে বীরের মর্যাদায় বরণ করে নেয় দেশবাসী। রানওয়েতেই তাকে স্বাগত জানান সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন উচ্ছ্বসিত সমর্থকেরা।
আরও পড়ুনঃ হাতের মুঠোয় বিশ্বকাপ: মোবাইলে খেলা দেখার সব উপায়
সমর্থকদের উদ্দেশে আরতান বলেন, ‘সোমালিয়া আমাদের সবার। সময় ভালো হোক বা খারাপ, আমি দেশের তরুণদের বলতে চাই—তোমরা কখনো নিজের দেশের প্রতি আশা হারিয়ে ফেলো না।’
মঙ্গলবার সোমালিয়ার যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, তারা এ ঘটনায় ‘গভীরভাবে মর্মাহত’। মন্ত্রণালয় জানায়, সরকার ব্যাপক কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছিল এবং মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়েছিল, কিন্তু কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি।
ফিফা জানিয়েছে, বিষয়টি পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। তাই এ ব্যাপারে তাদের কিছু করার ছিল না। তবে সোমালিয়ার কয়েকজন কর্মকর্তা আল জাজিরাকে বলেছেন, শেষ পর্যন্ত এ ঘটনার দায় এড়াতে পারে না ফিফা।
সোমালি ক্রীড়া সাংবাদিক মোহাম্মদ সালাদ এ ঘটনাকে দেশের জন্য বড় ধাক্কা বলে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, ‘ওমর নির্বাচিত হওয়ার পর সোমালিরা এমনভাবে উদ্যাপন করেছিল, যেন জাতীয় দল বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে। প্রথমবারের মতো সোমালিয়ায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা একজন মানুষ ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে আমাদের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছিলেন।’
সাবেক সোমালি কূটনীতিক আবুকার আরমান বলেন, আরতান কোনো নিরাপত্তা হুমকি নন এবং তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক রেকর্ডও নেই।
আরমান বলেন, ‘এটি ট্রাম্পের প্রতিহিংসাপরায়ণ ও আবেগপ্রবণ রাজনীতির আরেকটি উদাহরণ, যেখানে সোমালিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত যেকোনো কিছু নিয়মিতভাবে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়।’
কেন আরতানকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। হোয়াইট হাউসের বিশ্বকাপ টাস্কফোর্সের পরিচালক অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি এক অনুষ্ঠানে বলেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ‘যথেষ্ট কারণ’ ছিল। তবে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
পরে এক মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেন, একজন সোমালি নাগরিককে প্রবেশ করতে না দেওয়ার কারণ ছিল এমন কিছু ব্যক্তির সঙ্গে তার কথিত যোগাযোগ, যাদের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার সন্দেহ রয়েছে।
ক্রীড়া-অভিবাসন আইনজীবী ক্রিস কার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রবেশ নিষেধ করার কোনো কারণ থাকতেই পারে, কিন্তু আরতানের মতো পরিচিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্ত অত্যন্ত অস্বাভাবিক।
তিনি বলেন, ‘তার অর্জন ও পেশাগত পরিচয় বিবেচনায় এটি অত্যন্ত বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত।’
মোগাদিশুতে জন্ম নেওয়া আরতান দীর্ঘদিন ধরেই সোমালি ফুটবলপ্রেমীদের কাছে গর্বের প্রতীক। ১৯৯১ সালে সোমালি রাষ্ট্রব্যবস্থার পতনের পর দীর্ঘ সময় দেশটির খেলাধুলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রায় অনুপস্থিত ছিল। সেই বাস্তবতায় আরতানের উত্থান বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
২০১৮ সালে সোমালি ন্যাশনাল লিগে দায়িত্ব পালন করার সময় তিনি বলেছিলেন, বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রেফারিং করার স্বপ্ন দেখেন।
তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমার ইচ্ছা ও আত্মবিশ্বাস আছে। আল্লাহর সাহায্যে একদিন আমি বিশ্বের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্টগুলোতে দায়িত্ব পালন করব এবং সোমালিয়াকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরব।’
তরুণদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেছিলেন, ‘তুমি যা অর্জন করতে চাও, যদি তার জন্য কঠোর পরিশ্রম করো এবং নিজেকে পুরোপুরি নিবেদন করো, তাহলে সফল হওয়া সম্ভব।’
ক্যারিয়ারের শুরুতে চোটের কারণে খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন ছেড়ে রেফারিংয়ে মনোযোগ দেন আরতান। মোগাদিশুর অনিরাপদ পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি নিয়মিত ম্যাচ পরিচালনা করেছেন। অনেক সময় নিরাপত্তার কারণে তাকে পথ পরিবর্তন করেও মাঠে পৌঁছাতে হয়েছে।
২০০৬ সাল থেকে সোমালিয়া সরকার আল-কায়েদা-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠী আল-শাবাবের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। দেশটিতে এখনো নিয়মিত সহিংস হামলা ঘটে।
আরতান প্রথম বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে দায়িত্ব পালন করেন ২০২৩ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে। সেখানে তার দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী রেফারিং ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। একই সঙ্গে সোমালিয়ার ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যেও নতুন আশার সঞ্চার করে।
পূর্ব আফ্রিকার সংবাদমাধ্যম দ্য ইস্টলি ভয়েস আফকনে তার অংশগ্রহণকে ‘সোমালি ফুটবলের জন্য যুগান্তকারী মুহূর্ত’ বলে উল্লেখ করে।
আফকনে তার প্রথম ম্যাচ ছিল নামিবিয়া ও তিউনিসিয়ার মধ্যে। সাংবাদিক মোহাম্মদ সালাদ বলেন, ‘হাজার হাজার সোমালি সেই ম্যাচ দেখেছিল শুধু এটা দেখার জন্য যে তাদের মানুষটি চাপের মধ্যে কীভাবে দায়িত্ব পালন করেন।’
২০২৫ সালে আফ্রিকার বর্ষসেরা রেফারি নির্বাচিত হন আরতান। চলতি বছর ফিফা তাকে বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচন করে।
সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদ তার প্রশংসা করে বলেন, তিনি ‘নতুন প্রজন্মের সোমালিদের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক’ হয়ে উঠেছেন।
বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়ার পর আরতান বলেছিলেন, ‘প্রথম সোমালি হিসেবে সেখানে যেতে পারা আমার জন্য গর্বের। আমি আশা করি সেখানে অসাধারণ পারফরম্যান্স করব।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি ম্যাচে আপনাকে নিখুঁত হতে হবে। একটি ভুল আপনার সব অর্জনকে ম্লান করে দিতে পারে।’
সোমালিয়ার যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক মহাপরিচালক জামাল শিল বলেন, আরতান এখন দেশের ‘ঘরে ঘরে পরিচিত নাম’।
তিনি বলেন, ‘তিনি প্রথমে সোমালিয়ায় সেরা হয়েছেন, তারপর আফ্রিকায় সেরা হয়েছেন, এরপর বিশ্বকাপে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছেন। তিনি সোমালিয়া ও পুরো আফ্রিকার তরুণদের জন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছিলেন।’
তার মতে, এ ঘটনা অনেক তরুণকে হতাশ করতে পারে।
তিনি বলেন, ‘অনেকে ভাবতে পারে—আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করলাম, সবকিছু ঠিকঠাক করলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এমন একটি ঘটনা সবকিছু কেড়ে নিতে পারে।’
আরতানের প্রতি সমর্থনের ঢল নেমেছে দেশ-বিদেশে। সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আবদুল্লাহি ফারমাজো এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসান আলি খাইরে-সহ বেশ কয়েকজন বিরোধী নেতা তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। জিবুতির অর্থমন্ত্রী ইলিয়াস মুসা দাওয়ালেহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমরা সবাই ওমর আবদুলকাদির আরতান।’
সোমালিয়ার স্থানীয় লিগের একটি ম্যাচেও সমর্থকেরা তার ছবি হাতে নিয়ে সংহতি প্রকাশ করেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ইংল্যান্ডের সাবেক ফুটবলার ইয়ান রাইট বলেন, ‘প্রতি কয়েক ঘণ্টা পরপর নতুন একটি গল্প সামনে আসছে। কখনো সমর্থক, কখনো খেলোয়াড়, কখনো কর্মকর্তা, কখনো সাংবাদিক—এবার রেফারি। আয়োজক দেশ কি এভাবেই আচরণ করে?’
ব্রিটেনের সাবেক বিরোধীদলীয় নেতা জেরেমি করবিন এ ঘটনাকে ‘চরম লজ্জাজনক’ বলে বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, ‘ফিফা অনুমোদিত একজন রেফারিকে শুধু তিনি সোমালি বলে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।’
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এ সিদ্ধান্তকে ‘উল্টো ফল বয়ে আনা’ এবং ‘ভীষণ পশ্চাৎমুখী’ বলে মন্তব্য করেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসও আরতানের পাশে দাঁড়ান।
তিনি লেখেন, ‘প্রথম সোমালি রেফারি হিসেবে এবং আফ্রিকার সেরা রেফারি হিসেবে তিনি ইতিহাস গড়েছেন। যা-ই ঘটুক, সেই অর্জন অটুট থাকবে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘বিশ্বমঞ্চে আপনার গল্প এখানেই শেষ হচ্ছে না।’

