অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে টেস্ট জয়ের স্বপ্ন এখন দেখতেই পারে বাংলাদেশ। ডারউইন টেস্টের তৃতীয় দিন শেষে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই বাংলাদেশের হাতে। দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ উইকেটে ১৬১ রান নিয়ে দিন শেষ করেছে অস্ট্রেলিয়া, তারা এখনো পিছিয়ে আছে ৬৭ রানে। বাংলাদেশের সামনে এখন লক্ষ্য—চতুর্থ দিনেই ম্যাচের সমাপ্তি টেনে ঐতিহাসিক এক জয় তুলে নেওয়া।
ম্যাচটি চতুর্থ দিনে গড়াবে কি না, তৃতীয় দিনের শেষ পর্যন্ত সেটিই ছিল আলোচনার বিষয়। দিনের খেলা শেষে ডারউইনের দর্শকেরা অনেকটাই নিশ্চিত হয়েই ঘরে ফিরেছেন, পঞ্চম দিনে ম্যাচ গড়ানোর সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। তবে অস্ট্রেলিয়ার সমর্থকেরা নিশ্চয়ই চাইবেন লড়াইটা শেষ দিন পর্যন্ত গড়াক। কারণ চতুর্থ দিনেই ম্যাচ শেষ হলে সেই সমাপ্তি বাংলাদেশের জয়ের দিকেই যাবে।
আরও পড়ুনঃ দ্বিতীয় দিনেও বাংলাদেশের দাপট, ১৫৩ রানের লিড
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে একটি টেস্ট দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনার পেছনে এবার যে দলটি সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে, সেটি বাংলাদেশ—এটাই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় চমক। অন্যদিকে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্য এখন শুধু সময় বাড়ানো। দ্বিতীয় ইনিংসে যত বেশি সম্ভব রান করে শেষ দিনে লড়াইয়ের সুযোগ তৈরি করতে চাইবে তারা।
ডারউইন টেস্টের বর্তমান অবস্থাই বলে দিচ্ছে কেন বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস বাড়ছে। তৃতীয় দিন শেষে অস্ট্রেলিয়া ৪ উইকেটে ১৬১ রান করেছে। এর আগে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস শেষ হয় ৪২৬ রানে। টেলএন্ডারদের দৃঢ় ব্যাটিংয়ে লাঞ্চের পর ইনিংস শেষ হওয়ার আগে বাংলাদেশ পেয়েছে ২২৮ রানের গুরুত্বপূর্ণ লিড। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইনিংস। ২০০৬ সালের ফতুল্লা টেস্টে করা ৪২৭ রান এখনো শীর্ষে।
বাংলাদেশের লিড ২০৬ ছাড়ানোর পর থেকেই অস্ট্রেলিয়ার সামনে তৈরি হয়েছে কঠিন এক সমীকরণ। নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে ঘরের মাঠে প্রথম ইনিংসে ২০৬ বা তার বেশি রানে পিছিয়ে পড়ে কোনো ম্যাচ জেতেনি অস্ট্রেলিয়া। ডারউইনে জিততে হলে তাই নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাটতি পুষিয়ে নতুন রেকর্ড গড়তে হবে তাদের।
তবে তৃতীয় দিনের শেষ সেশনে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং দেখে সেই সম্ভাবনা আরও কঠিন মনে হয়েছে। প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নেওয়া হাসান মাহমুদ দ্বিতীয় ইনিংসেও শুরুতেই আঘাত করেন। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে জেক ওয়েদারাল্ডকে বোল্ড করেন তিনি। পরে ১১তম ওভারে সাজঘরে ফেরান ট্রাভিস হেডকে।
হাসানের বলে কাট করতে গিয়ে বিপদে পড়েন হেড। শরীরের কাছাকাছি থাকা বল ব্যাটের কানায় লেগে ভেঙে দেয় স্টাম্প। ৩৭ রানে ২ উইকেট হারানোর পর অস্ট্রেলিয়ার ভরসা হয়ে উঠেছিলেন মারনাস লাবুশেন ও স্টিভেন স্মিথ। তৃতীয় উইকেটে ৩৬ রানের জুটিও গড়েছিলেন তারা।
কিন্তু তাইজুল ইসলামের বলে লাবুশেন বোল্ড হলে আবার চাপে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। ৫৯ বলে ৩১ রান করেন তিনি। এরপর মেহেদী হাসান মিরাজের বলে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন স্মিথ। তাঁর ব্যাট থেকে আসে ৪৪ রান। ১২২ রানে চতুর্থ উইকেট হারানোর পর ডারউইনের প্রেসবক্সে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে—টেস্টটি কি চতুর্থ দিনেই শেষ হবে?
অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে অবশ্য ভাগ্যেরও কিছুটা সহায়তা পেয়েছে তারা। ক্যামেরন গ্রিনের স্টাম্পে তাসকিন আহমেদের বল আঘাত করলেও বেলস পড়েনি। এমনকি বলটি বাউন্ডারিও পেরিয়ে যায়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আর কোনো উইকেট না হারিয়ে দিন শেষ করেছে অস্ট্রেলিয়া।
আরও পড়ুনঃ মিরাজকে মিচেল স্টার্কের হুমকি—‘তুমি এখন বাংলাদেশে নেই’
বাংলাদেশের এই অবস্থানের মূল কৃতিত্ব প্রথম ইনিংসের লেজের দিকের ব্যাটসম্যানদের। মেহেদী হাসান মিরাজের ১৫৪ বলে ৬৫ রানের ইনিংসকে কেন্দ্র করে টেলএন্ডাররা অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের দীর্ঘ সময় ব্যস্ত রাখেন। হাসান মাহমুদ, তাইজুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ ও ইবাদত হোসেন নিজেদের সামর্থ্যের চেয়েও বেশি অবদান রাখেন।
অস্ট্রেলিয়ানদের হতাশার জায়গা ছিল ফিল্ডিং। এক সেশনে তিনটি ক্যাচ হাতছাড়া করেছে তারা, যার মধ্যে একই ওভারে ছিল দুটি সুযোগ। এ বিষয়ে তারা হয়তো বলবে, ‘ঝামেলা তো পাকিয়েছে আমাদের ফিল্ডাররা। এক সেশনে তিনটা ক্যাচ ফেলে কেউ? তা–ও আবার এক ওভারে দুইটা। ক্যাচ ফেললে টেলএন্ডার ব্যাটসম্যান কেন, শিশুরাও রান করত পারবে।’
বাংলাদেশের লোয়ার অর্ডারের লড়াইয়ের গল্পটা ছিল অসাধারণ। মিরাজ–হাসান জুটিতে সপ্তম উইকেটে আসে ৪৬ রান। মিরাজ–তাইজুল অষ্টম উইকেটে যোগ করেন ১৮ রান। নবম উইকেটে মিরাজ–তাসকিনের জুটি থেকে আসে ৪ রান। শেষ উইকেটে তাসকিন ও ইবাদত যোগ করেন ৮ রান, যার মধ্যে ছিল ইবাদতের বিশাল ছক্কা।
অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের মধ্যে জশ হ্যাজলউড ৬ উইকেট নিয়ে টেস্টে ৩০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করলেও বাংলাদেশের লোয়ার অর্ডারের প্রতিরোধের কারণে সেই অর্জনের আনন্দ পুরোপুরি উপভোগ করতে পারেনি স্বাগতিকরা।
তৃতীয় দিনের শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দিকে নিয়ে নেয় বাংলাদেশ। তানজিম হাসান আগেই বলেছিলেন, ‘ক্যাচ ধরবে–ক্যাচ পড়বে এসব খেলারই অংশ।’ সেই মানসিকতা নিয়েই লড়াই করে বাংলাদেশ এখন ডারউইন টেস্ট জয়ের খুব কাছাকাছি।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
অস্ট্রেলিয়া: ১৯৮ ও ৫৩ ওভারে ১৬১/৪ (স্টিভেন স্মিথ ৪৪, ক্যামেরন গ্রিন ৪৩*, মারনাস লাবুশেন ৩১, ট্রাভিস হেড ১৭, অ্যালেক্স ক্যারি ৭*; হাসান মাহমুদ ২/৩৩, তাইজুল ইসলাম ১/২৮, মেহেদী হাসান মিরাজ ১/২০)
বাংলাদেশ: ৪২৬

