২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে অফসাইড সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। দেরিতে অফসাইডের পতাকা তোলার কারণে যে বিতর্ক, হতাশা ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা কমাতে বিশ্বকাপে উন্নত সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। নতুন এই প্রযুক্তির মাধ্যমে অফসাইড শনাক্তকরণ আরও দ্রুত হবে এবং অনেক ক্ষেত্রে সহকারী রেফারিরা খেলা চলতে দেওয়ার পরিবর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
ফিফা জানিয়েছে, নতুন ব্যবস্থায় কোনো খেলোয়াড় যদি ১০ সেন্টিমিটারের বেশি অফসাইড অবস্থানে থাকেন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সহকারী রেফারির কাছে একটি রিয়েল-টাইম অডিও সতর্কবার্তা পৌঁছে যাবে। এর ফলে অফসাইড শনাক্ত হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিতে সময় কম লাগবে এবং দীর্ঘ সময় খেলা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনও কমে আসবে।
এর আগে ক্লাব বিশ্বকাপ ও ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহৃত প্রযুক্তি কেবল তখনই কর্মকর্তাদের সতর্ক করত, যখন কোনো খেলোয়াড় ৫০ সেন্টিমিটারের বেশি অফসাইডে থাকতেন। নতুন প্রযুক্তি সেই সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে।
তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখনও সহকারী রেফারির হাতেই থাকবে। প্রযুক্তিতে কোনো ত্রুটি হয়েছে বলে সন্দেহ হলে তিনি পতাকা তুলতে দেরি করতে পারবেন। ফিফার দাবি, সম্ভাব্য ভুল এড়াতে প্রযুক্তির মধ্যে একাধিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংযোজন করা হয়েছে।
যদিও প্রযুক্তিটি অফসাইড শনাক্তকরণকে আরও দ্রুত করবে, তবু এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। খুব অল্প ব্যবধানের অফসাইড, মাটিতে পড়ে থাকা খেলোয়াড় কিংবা একাধিক খেলোয়াড় খুব কাছাকাছি অবস্থানে থাকলে প্রযুক্তিটি সব সময় নির্ভুল সিদ্ধান্ত দিতে নাও পারে।
এ ছাড়া এটি শুধুমাত্র পজিশনাল অফসাইড শনাক্ত করতে সক্ষম হবে। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে, যেখানে কোনো খেলোয়াড় বল স্পর্শ না করেও প্রতিপক্ষের খেলায় প্রভাব ফেলেছেন কি না, সেই ধরনের ব্যাখ্যাভিত্তিক বা সাবজেকটিভ সিদ্ধান্ত প্রযুক্তি দিতে পারবে না। এসব ক্ষেত্রে রেফারিদের বিচার-বিবেচনার ওপরই নির্ভর করতে হবে।
ফিফার আশা, নতুন এই ব্যবস্থা দর্শক ও খেলোয়াড়দের হতাশা কমাবে এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে খেলা চালিয়ে যাওয়ার ফলে সম্ভাব্য চোটের ঝুঁকিও হ্রাস করবে।
এর পেছনে সাম্প্রতিক একটি ঘটনার প্রভাব রয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে নটিংহ্যাম ফরেস্টের স্ট্রাইকার তাইও আওনিয়ি অফসাইডের পতাকা দেরিতে ওঠার কারণে খেলা চালিয়ে যেতে গিয়ে গোলপোস্টে ধাক্কা খেয়ে গুরুতর আহত হন। পরে তাকে কৃত্রিম কোমায় রাখতে হয়েছিল। ঘটনাটি দেরিতে অফসাইডের পতাকা তোলার নীতিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে।
অফসাইড সিদ্ধান্তকে আরও নির্ভুল করতে নতুন আরেকটি উদ্যোগ নিয়েছে ফিফা। সংস্থাটি জানিয়েছে, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া প্রতিটি খেলোয়াড়ের বাস্তবসম্মত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সমর্থিত থ্রিডি অবতার তৈরি করা হবে।
এজন্য ৪৮টি দলের ২৬ সদস্যের স্কোয়াড মিলিয়ে মোট ১ হাজার ২৪৮ জন খেলোয়াড়ের ডিজিটাল স্ক্যান করা হবে। প্রত্যেক খেলোয়াড়কে একটি বিশেষ স্ক্যানিং চেম্বারে প্রবেশ করতে হবে, যেখানে মাত্র এক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো শরীরের স্ক্যান সম্পন্ন হবে। বিশ্বকাপ-পূর্ব আনুষ্ঠানিক ফটোশুটের সময় একবারই এই স্ক্যান করা হবে।
ফিফার মতে, এর ফলে অফসাইডের থ্রিডি অ্যানিমেশন আরও উন্নত, স্পষ্ট ও সহজবোধ্য হবে এবং সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করা সহজ হবে।
আরও পড়ুনঃ মেসির রুম নম্বর নিয়ে ভক্তদের মধ্যে কুসংস্কার, আলোচনার ঝড়
অফসাইড প্রযুক্তির পাশাপাশি বল মাঠের বাইরে গিয়েছিল কি না, সেটি নির্ধারণের জন্যও নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। ফিফা এমন একটি ব্যবস্থা অনুমোদন দিয়েছে, যা কোনো গোল হওয়ার আগে বল মাঠের বাইরে গিয়েছিল কি না তা নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারবে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অ্যাস্টন ভিলা ও ব্রেন্টফোর্ডের ম্যাচে এমন একটি বিতর্কিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে বল মাঠের বাইরে গিয়েছিল কি না তা স্পষ্ট না হওয়ায় অ্যাস্টন ভিলার একটি গোল বাতিল করা হয়।
নতুন প্রযুক্তিতে গোললাইন প্রযুক্তির মতোই একটি থ্রিডি অ্যানিমেশন তৈরি হবে, যা বলের সঠিক অবস্থান প্রদর্শন করবে। একই সঙ্গে বলের ভেতরে থাকা চিপ শনাক্ত করতে পারবে সর্বশেষ কোন খেলোয়াড় বলটি স্পর্শ করেছিলেন। এর ফলে কর্নার কিক কিংবা গোল কিকের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল কি না, তা যাচাই করা VAR কর্মকর্তাদের জন্য আরও সহজ হবে।
এ ছাড়া ফিফা তাদের রিয়েল-টাইম থ্রিডি রিক্রিয়েশন প্রযুক্তির ব্যবহারও সম্প্রসারণ করেছে। এর মাধ্যমে গোলরক্ষকের দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল কি না, সে ধরনের ‘লাইন অব সাইট’ অফসাইড সিদ্ধান্ত আরও দ্রুত ও স্পষ্টভাবে নেওয়া যাবে।
এই ব্যবস্থায় দুটি ভার্চুয়াল ভিডিও ফিড থাকবে, যা VAR কর্মকর্তা এবং টেলিভিশন দর্শকদের কাছে গোলরক্ষকের দৃষ্টিকোণ থেকে দৃশ্য উপস্থাপন করবে। ফলে গোলরক্ষকের সামনে থাকা কোনো খেলোয়াড় তার দৃষ্টিসীমায় প্রভাব ফেলেছিলেন কি না, তা আরও নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
গত মৌসুমে ‘লাইন অব সাইট’ অফসাইড নিয়ে বেশ কয়েকটি বিতর্ক দেখা যায়, যেখানে প্রশ্ন উঠেছিল কোনো খেলোয়াড় গোলরক্ষকের দৃষ্টি আড়াল করেছিলেন কি না। নতুন প্রযুক্তি সেই ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে VAR কর্মকর্তাদের জন্য অতিরিক্ত সহায়ক হিসেবে কাজ করবে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত ও উন্নত হতে যাচ্ছে। ফিফার বিশ্বাস, এসব নতুন উদ্ভাবন সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও দ্রুত, নির্ভুল ও স্বচ্ছ করে তুলবে এবং খেলার ন্যায়সঙ্গত পরিবেশ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

