দলবদলের মৌসুমে কত টাকা খরচ করল ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগ

জ

জিটি রিপোর্ট

প্রকাশ:

 প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে দাবি ফুটবলার এনজো
প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে দাবি ফুটবলার এনজো |ছবি: সংগৃহীত

ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের এবারের গ্রীষ্মকালীন দলবদলে ক্লাবগুলো খরচ করেছে প্রায় ৬৬০ কোটি পাউন্ড। মোট ১ হাজার ৪৩৯টি দলবদল চুক্তিতে এই অর্থ খরচ হয়েছে। খরচের হিসাবে সবার ওপরে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ। শুধু ইংল্যান্ডের শীর্ষ লিগের ক্লাবগুলোই খরচ করেছে ৩৪৬ কোটি পাউন্ড।

ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগ বলতে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, স্প্যানিশ লা লিগা, জার্মান বুন্দেসলিগা, ইতালিয়ান সিরি আ ও ফরাসি লিগ ওয়ানকে বোঝানো হচ্ছে। ১ সেপ্টেম্বর দলবদলের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর হিসাবটি আরও স্পষ্ট হয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের হিসাবে শীর্ষ পাঁচ লিগে মোট দলবদলের আর্থিক মূল্য প্রায় ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন পাউন্ড।

প্রিমিয়ার লিগে খরচের নতুন রেকর্ড

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলো এবার খেলোয়াড় কিনতে মোট ৩৪৬ কোটি পাউন্ড খরচ করেছে। এর মধ্য দিয়ে গ্রীষ্মকালীন দলবদলে নিজেদের আগের রেকর্ড ভেঙেছে তারা।

গত গ্রীষ্মে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলো খরচ করেছিল ৩১৪ কোটি পাউন্ড। এত দিন সেটিই ছিল এক মৌসুমের গ্রীষ্মকালীন দলবদলে সর্বোচ্চ খরচ। এবার সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

প্রিমিয়ার লিগের খরচ ৩০০ কোটি পাউন্ডের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল আগেই। এরপর শেষ দিনে ইলিমান এনদিয়ায়ের এভারটন থেকে ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেওয়ার দলবদলটি বড় ভূমিকা রাখে। শুরুতে এই দলবদলের ফি ছিল ৬ কোটি পাউন্ড। বিভিন্ন শর্ত পূরণ হলে অঙ্কটি আরও বাড়তে পারে।

আরও পড়ুনঃ পূর্ণ শক্তির দল নিয়েই এশিয়ান গেমসে যাচ্ছে বাংলাদেশ

এরপর দলবদলের সময় শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পর নিশ্চিত হয় এনজো ফার্নান্দেজের ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেওয়ার খবর। চেলসি থেকে আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডারকে ১২ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ডে কিনেছে সিটি। এই অঙ্ক যৌথভাবে ব্রিটিশ দলবদল রেকর্ড।

এর আগে গত গ্রীষ্মে নিউক্যাসল ইউনাইটেড থেকে আলেকসান্দার ইসাককে একই ১২ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ডে কিনেছিল লিভারপুল। ফলে ফার্নান্দেজের দলবদল সেই রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছে।

শেষ দিনেও বিপুল খরচ

দলবদলের শেষ দিনেও রীতিমতো অর্থের ঝড় বইয়ে দিয়েছে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলো। শুধু শেষ দিনেই খরচ হয়েছে ৪৭ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড।

গত মৌসুমের শেষ দিনে খরচ হয়েছিল ৩৯ কোটি ১০ লাখ পাউন্ড। অর্থাৎ এবার শেষ দিনের খরচও আগের মৌসুমের তুলনায় অনেক বেশি।

সব মিলিয়ে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর ৩৪৬ কোটি পাউন্ডের খরচ ইউরোপের অন্য শীর্ষ লিগগুলোর তুলনায় তাদের আর্থিক শক্তি কতটা বেশি, সেটিই আবার দেখিয়েছে।

পাঁচ বছর আগের তুলনায় তিন গুণের বেশি

প্রিমিয়ার লিগের এবারের খরচের সঙ্গে পাঁচ বছর আগের হিসাবের বড় পার্থক্য রয়েছে।

পাঁচ বছর আগে ইংল্যান্ডের শীর্ষ লিগের ক্লাবগুলো দলবদলে খরচ করেছিল ১১৩ কোটি পাউন্ড। এবার সেই অঙ্ক তিন গুণেরও বেশি হয়েছে।

ফুটবলট্রান্সফার্স ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা পল ম্যাকডোনাল্ডের দেওয়া হিসাবের ভিত্তিতে এই তথ্য প্রকাশ করেছে বিবিসি স্পোর্ট। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, এবারের খরচ ইংলিশ ফুটবলের আর্থিক সামর্থ্য ও শীর্ষ খেলোয়াড়দের আকর্ষণ করার ক্ষমতাকে স্পষ্ট করেছে।

বড় দলবদলে ইংল্যান্ডের দাপট

এবারের দলবদলে সবচেয়ে বড় চুক্তিগুলোর বেশির ভাগই হয়েছে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর মধ্যে।

এনজো ফার্নান্দেজ ১২ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ডে ম্যানচেস্টার সিটিতে গেছেন। ম্যানচেস্টার সিটি এর আগে নটিংহ্যাম ফরেস্টের মিডফিল্ডার এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে ১১ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ডে কিনেছে।

চেলসি অ্যাস্টন ভিলা থেকে মরগান রজার্সকে দলে নিয়েছে ১১ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ডে।

আর পিএসজি থেকে ফরাসি ফরোয়ার্ড ব্র্যাডলি বারকোলাকে দলে ভিড়িয়েছে লিভারপুল। চুক্তিটির প্রাথমিক মূল্য ১০ কোটি ৬ লাখ পাউন্ড। বিভিন্ন শর্ত পূরণ হলে সেটি ১২ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে।

অর্থাৎ এবারের দলবদলে সবচেয়ে ব্যয়বহুল কয়েকটি চুক্তির প্রায় সবই ইংলিশ ক্লাবগুলোর সঙ্গে জড়িত।

ম্যানচেস্টার সিটি সবচেয়ে বেশি খরুচে

ক্লাব হিসেবে এবারের দলবদলে সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ করেছে ম্যানচেস্টার সিটি। ফার্নান্দেজকে কেনার পর তাদের মোট খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ডে।

এটি এক গ্রীষ্মকালীন দলবদলে কোনো প্রিমিয়ার লিগ ক্লাবের সর্বোচ্চ খরচের নতুন রেকর্ড। গত মৌসুমে লিভারপুল ৪১ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড খরচ করে যে রেকর্ড গড়েছিল, এবার সেটি ভেঙেছে সিটি।

ম্যানচেস্টার সিটির এই দলবদলের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে নতুন কোচ এনজো মারেসকার। পেপ গার্দিওলা ক্লাব ছাড়ার পর মারেসকার অধীনে নতুনভাবে দল সাজিয়েছে সিটি।

আরও পড়ুনঃ হাসান মাহমুদের পর এবার কাউন্টিতে খেলবেন খালেদ আহমেদ

ফার্নান্দেজ ছাড়াও সিটি এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে ১১ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ডে কিনেছে। লিল থেকে আয়ুব বুয়াদ্দিকে নেওয়া হয়েছে প্রায় ৮ কোটি ৫৭ লাখ পাউন্ডে।

এ ছাড়া এভারটন থেকে ইলিমান এনদিয়ায়েকে নেওয়ার চুক্তির প্রাথমিক মূল্য ৬ কোটি পাউন্ড। সব মিলিয়ে সিটির দলবদল ব্যয় প্রায় ৪৫ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ডে পৌঁছেছে।

তবে খেলোয়াড় কেনার পাশাপাশি বিক্রি থেকেও বড় অঙ্কের অর্থ পেয়েছে সিটি। ক্লাবটি খেলোয়াড় বিক্রি করে প্রায় ৩০ কোটি ৪ লাখ পাউন্ড আয় করেছে। ফলে মোট খরচের পুরোটা তাদের নিট ব্যয় নয়।

চেলসি দ্বিতীয়, টটেনহাম তৃতীয়

খরচের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চেলসি। নতুন খেলোয়াড় কিনতে ক্লাবটি খরচ করেছে প্রায় ৩৪ কোটি ৯০ লাখ পাউন্ড।

চেলসির সবচেয়ে বড় দলবদলগুলোর একটি ছিল মরগান রজার্সকে অ্যাস্টন ভিলা থেকে কেনা। তাঁর জন্য খরচ হয়েছে ১১ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ড।

তবে খেলোয়াড় বিক্রি থেকেও বড় অঙ্কের অর্থ পেয়েছে চেলসি। ক্লাবটি প্রায় ৩৮ কোটি ২০ লাখ পাউন্ডের খেলোয়াড় বিক্রি করেছে।

ফলে বিপুল অর্থ খরচ করেও দলবদল শেষে চেলসির নিট হিসাবে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ডের উদ্বৃত্ত রয়েছে।

খরচের তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে টটেনহাম হটস্পার। ক্লাবটি নতুন খেলোয়াড় কিনতে প্রায় ৩০ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড খরচ করেছে।

স্যান্ড্রো টোনালিকে দলে আনতে টটেনহামের চুক্তির মূল্য বিভিন্ন শর্ত পূরণ হলে ১০ কোটি পাউন্ড পর্যন্ত যেতে পারে। এ ছাড়া মাতেউস ফার্নান্দেজকেও প্রায় ৮ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ডে দলে নিয়েছে তারা।

প্রিমিয়ার লিগের বাইরে বড় দলবদল তুলনামূলক কম

শুধু বড় অঙ্কের দলবদলের দিকে তাকালেও প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক প্রভাব স্পষ্ট।

এবারের সবচেয়ে ব্যয়বহুল দলবদলগুলোর বড় অংশই ইংলিশ ক্লাবগুলোর মধ্যে হয়েছে। ম্যানচেস্টার সিটি, চেলসি, লিভারপুল ও টটেনহাম একাধিক বড় চুক্তি করেছে।

লিভারপুলের ব্র্যাডলি বারকোলা দলবদলের অন্যতম বড় নাম। পিএসজি থেকে তাঁকে আনতে প্রাথমিকভাবে ১০ কোটি ৬ লাখ পাউন্ড খরচ করেছে লিভারপুল। শর্ত পূরণ হলে অঙ্কটি ১২ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ডে উঠতে পারে।

এ ছাড়া প্রিমিয়ার লিগে সদ্য উঠে আসা ইপসউইচ টাউনও বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করেছে। ক্লাবটির মোট খরচ প্রায় ১৭ কোটি ১০ লাখ পাউন্ডে পৌঁছেছে। এই ব্যয় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের প্রায় ১৪ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ডের খরচের চেয়েও বেশি।

পাঁচ লিগে মোট খরচ ৬৬০ কোটি পাউন্ড

ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে এবারের দলবদলে মোট চুক্তির সংখ্যা ১ হাজার ৪৩৯টি। এসব চুক্তির মোট আর্থিক মূল্য প্রায় ৬৬০ কোটি পাউন্ড।

দ্য গার্ডিয়ানের হালনাগাদ হিসাবে এই সংখ্যা ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন পাউন্ড। একই সূত্রে মোট সম্পন্ন দলবদলের সংখ্যা ১ হাজার ৪৩৯টি।

অর্থাৎ ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ একাই প্রায় ৩৪৬ কোটি পাউন্ড খরচ করে পুরো ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের মোট ব্যয়ের বড় একটি অংশ দখল করেছে।

ফুটবলের অর্থনীতিতে বাড়ছে ইংল্যান্ডের প্রভাব

এবারের দলবদল ইউরোপীয় ফুটবলে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক প্রভাব আরও স্পষ্ট করেছে।

বিশাল টেলিভিশনস্বত্বের আয়, বাণিজ্যিক রাজস্ব ও ক্লাবগুলোর আর্থিক সক্ষমতার কারণে ইংলিশ ক্লাবগুলো অন্য লিগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ খরচ করতে পারছে।

এবারের গ্রীষ্মকালীন দলবদলে সেই ব্যবধান আরও বড় হয়েছে। একদিকে ম্যানচেস্টার সিটি একাই প্রায় ৪৫ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ড খরচ করেছে। অন্যদিকে চেলসি ও টটেনহামও ৩০ কোটির বেশি পাউন্ড ব্যয় করেছে।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের গ্রীষ্মকালীন দলবদল ইউরোপের ফুটবলে অর্থের দাপটের নতুন উদাহরণ হয়ে থাকল। আর সেই দাপটের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ।

মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!