বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ রাউন্ডে একই গ্রুপের দুটি ম্যাচ একই সময়ে আয়োজন করা হয়। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এটি পরিচিত দৃশ্য হলেও এর পেছনে রয়েছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার বিতর্কিত ম্যাচের পরই ফিফা এই নিয়ম চালু করতে বাধ্য হয়েছিল।
বর্তমান বিশ্বকাপেও গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলো একই সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো কোনো দল যেন আগে খেলা ম্যাচের ফল জেনে নিজেদের সুবিধামতো কৌশল নির্ধারণ করতে না পারে এবং প্রতিযোগিতার সুষ্ঠুতা বজায় থাকে।
এই নিয়মের সূত্রপাত ১৯৮২ সালের ২৫ জুন স্পেনের গিহোন শহরের এল মোলিনোন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার ম্যাচকে ঘিরে। ইতিহাসে যা ‘গিহোনের কলঙ্ক’ নামে পরিচিত।
সেই বিশ্বকাপে নবাগত আলজেরিয়া শুরুতেই চমক দেখিয়ে শক্তিশালী পশ্চিম জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল। তখনকার ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন জার্মানির এক খেলোয়াড় ম্যাচের আগে বলেছিলেন, সিগার ফুঁকতে ফুঁকতেও আলজেরিয়াকে হারানো সম্ভব। কিন্তু মাঠে তার উল্টো চিত্র দেখা যায়। মরুভূমির শিয়ালেরা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয় ঐতিহাসিক জয়ে।
আরও পড়ুনঃ বিশ্বকাপে নকআউট পর্ব নিশ্চিত ১৩ দলের, কোন দলের কাদের বিপক্ষে খেলা
গ্রুপ পর্বে নিজেদের সব ম্যাচ শেষ করে আলজেরিয়া চার পয়েন্ট সংগ্রহ করেছিল। কিন্তু তাদের শেষ ম্যাচের পর পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া জেনে যায়, কোন ফলাফল হলে দুই দলই একসঙ্গে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠতে পারবে।
ম্যাচের মাত্র ১০ মিনিটে গোল করে এগিয়ে যায় পশ্চিম জার্মানি। এরপরই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। বাকি প্রায় ৮০ মিনিট দুই দল এমন ফুটবল খেলে, যা আজও বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
গোলের পর থেকে দুই দলের কেউই আর আক্রমণে আগ্রহ দেখায়নি। মাঠজুড়ে চলতে থাকে নিরাপদ পাসের আদান-প্রদান। খেলোয়াড়দের আচরণ দেখে মনে হচ্ছিল, ফলাফল ধরে রাখাই যেন উভয় দলের একমাত্র লক্ষ্য।
পরিসংখ্যানও সেই অভিযোগের পক্ষে কথা বলে। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে গোলে ছিল মাত্র দুটি শট। বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে দ্বিতীয়ার্ধে এত কম শটের নজির আর দেখা যায়নি। ৫৪তম মিনিটের পর শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত কোনো দলই একটি শট নিতে পারেনি।
দ্বিতীয়ার্ধে দুই দলের মোট পাসের ৫৮ শতাংশই হয়েছিল নিজেদের অর্ধে। অথচ বিশ্বকাপের স্বাভাবিক গড় মাত্র ৪১ শতাংশ। ফলে দর্শকদের কাছে ম্যাচটি দ্রুতই বিরক্তি ও ক্ষোভের কারণ হয়ে ওঠে।
গ্যালারিতে উপস্থিত স্প্যানিশ দর্শকেরা চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘ফুয়েরা! ফুয়েরা!’ (বেরিয়ে যাও!)। আলজেরীয় সমর্থকেরা টাকার নোট নাড়িয়ে ম্যাচ পাতানোর অভিযোগে প্রতিবাদ জানান। এমনকি এক জার্মান সমর্থক ক্ষোভে নিজের দেশের পতাকাও পুড়িয়ে ফেলেন।
ম্যাচটি নিয়ে সংবাদমাধ্যমেও ব্যাপক সমালোচনা হয়। স্পেনের একটি পত্রিকা খেলার পাতার বদলে অপরাধবিষয়ক পাতায় ম্যাচের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। জার্মানির একটি সংবাদপত্র লিখেছিল, জার্মানির এই ঘটনার জন্য লজ্জিত হওয়া উচিত।
ম্যাচ চলাকালেই জার্মান ধারাভাষ্যকার এবেরহার্ড স্তানিয়েক বলেছিলেন, ‘যা হচ্ছে তা লজ্জাজনক। ফুটবলের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।’
অস্ট্রিয়ার ধারাভাষ্যকার রবার্ট সিগারও দর্শকদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘টেলিভিশন বন্ধ করে দিন।’
আরও পড়ুনঃ ফাউল করে ইসমাইল কোনের পা ভেঙে ফেলায় বড় শাস্তি পেল কাতারের মাদিবো
ঘটনার পর আলজেরিয়া ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করে। তবে বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল না। কারণ তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নিয়ম ভঙ্গ করেনি।
তবে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বড় সিদ্ধান্ত নেয় ফিফা। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপের পর থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের শেষ দুটি ম্যাচ একই সময়ে আয়োজন বাধ্যতামূলক করা হয়।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সেই নিয়মই অনুসরণ করে আসছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। আর সেই কারণেই আজও বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ রাউন্ডে একই গ্রুপের ম্যাচগুলো একসঙ্গে শুরু হয়, যাতে কোনো দল অন্য ম্যাচের ফল জেনে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ না পায় এবং প্রতিযোগিতার ন্যায্যতা অক্ষুণ্ন থাকে।

