মেসি ম্যাজিকে উজ্জীবিত আর্জেন্টিনা, লক্ষ্য টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ

জিটি রিপোর্ট

প্রকাশ:

আর্জেন্টিনা ফুটবল দল
আর্জেন্টিনা ফুটবল দল |ছবি: সংগৃহীত

মেসি–ম্যাজিকে উজ্জীবিত আর্জেন্টিনা এখন আবারও বিশ্বকাপ ধরে রাখার মিশনে। আইসল্যান্ডের বিপক্ষে ৩–০ গোলের দাপুটে জয়ে প্রস্তুতি শেষ করে লিওনেল স্কালোনির দল জানিয়ে দিয়েছে, তারা টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যেই মাঠে নামতে প্রস্তুত। প্রস্তুতি ম্যাচের ধারাবাহিকতা, বাছাইপর্বের আধিপত্য এবং অভিজ্ঞ–তরুণদের চমৎকার সমন্বয়ে আর্জেন্টিনা এবারও শিরোপার অন্যতম প্রধান দাবিদার। আর এই পুরো দলকে ঘিরে আছেন এক নাম—লিওনেল মেসি, যিনি এখনো আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।

আর্জেন্টিনার এই সোনালি অধ্যায়ের শুরুটা হয় ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা দিয়ে। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ব্রাজিলকে ১–০ গোলে হারিয়ে তারা দক্ষিণ আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধার করে। এরপর ইউরো চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে হারিয়ে ‘ফিনালিসিমা’ জিতে মেসির ট্রফি–জয়ের তালিকায় যোগ হয় আরেকটি আন্তর্জাতিক শিরোপা। কিন্তু সবার চোখ তখনও ছিল এক জায়গায়—বিশ্বকাপ। সেই স্বপ্ন পূরণ হয় ২০২২ কাতারে, যেখানে সৌদি আরবের বিপক্ষে অপ্রত্যাশিত হার দিয়ে শুরু করেও শেষ পর্যন্ত মেসির হাতে ওঠে বিশ্বকাপ ট্রফি।

আরও পড়ুনঃ রক্ষণভাগ নিয়ে ব্রাজিলের বড় দুশ্চিন্তা

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরও আর্জেন্টিনার জয়ের ক্ষুধা একটুও কমেনি, বরং আরও বেড়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তারা ছিল একক আধিপত্যের প্রতীক। ১৮ ম্যাচে ১২ জয়, ২ ড্র ও ৪ হারে ৩৮ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে থেকে শেষ করে আর্জেন্টিনা, যেখানে দ্বিতীয় স্থানে থাকা ইকুয়েডরের চেয়ে ব্যবধান ছিল ৯ পয়েন্ট। পুরো বাছাইপর্ব জুড়ে ব্রাজিলের মতো শক্তিশালী দলকেও দুই লেগেই হারিয়ে তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব আরও একবার প্রমাণ করেছে।

কোপা আমেরিকাতেও আর্জেন্টিনার আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মতো। গ্রুপপর্বে টানা তিন ম্যাচ জিতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শুরু করে তারা। এরপর ইকুয়েডরের বিপক্ষে কঠিন ম্যাচে টাইব্রেকারে ৪–২ গোলে জয় পেয়ে সেমিফাইনালে ওঠে। সেমিফাইনালে কানাডাকে ২–০ গোলে এবং ফাইনালে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা কলম্বিয়াকে ১–০ গোলে হারিয়ে তারা আবারও অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়। এই ধারাবাহিক সাফল্যই প্রমাণ করে, আর্জেন্টিনা এখনো বড় ম্যাচে ভয়হীন এবং জয়ী মানসিকতার দল।

স্কালোনির দলের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের স্থিতিশীলতা এবং মানসিক দৃঢ়তা। বিশ্বকাপজয়ী মূল কাঠামো প্রায় অক্ষুণ্ন রেখেছেন তিনি—এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, নিকোলাস ওতামেন্দি, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, রদ্রিগো দি পল, এনজো ফার্নান্দেজ, হুলিয়ান আলভারেজদের মতো খেলোয়াড়রা এখনও দলের প্রাণভোমরা। এই পরিচিত মুখগুলোই আর্জেন্টিনাকে দিয়েছে বোঝাপড়ার গভীরতা এবং বড় ম্যাচে স্থির থাকার শক্তি।

একই সঙ্গে স্কালোনি দলে এনেছেন নতুন প্রাণ। ভ্যালেন্তিন বারকো, গিওলিয়ানো সিমিওনে, ফাকুন্দো মেদিনা ও নিকো পাজদের মতো তরুণরা দলে এনেছে গতি ও নতুনত্ব। অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের এই সুন্দর মিশ্রণই আর্জেন্টিনাকে করেছে আরও ভারসাম্যপূর্ণ, আরও ভয়ংকর।

স্কালোনির কোচিংয়ে আর্জেন্টিনা এখন এক পরিণত ও শান্ত দল। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি দলটিকে গড়ে তুলেছেন পরিকল্পিতভাবে, যেখানে কোনো বড় বিতর্ক বা অস্থিরতা নেই। মেসির নেতৃত্বে সেই স্থিরতা আরও দৃঢ় হয়েছে। কৌশল, দল নির্বাচন কিংবা ম্যাচ ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই স্কালোনি এখন আস্থার প্রতীক।

সর্বশেষ প্রস্তুতি ম্যাচগুলোও আর্জেন্টিনার প্রস্তুতির শক্ত প্রমাণ। হন্ডুরাসকে ২–০ গোলে হারানোর পর আইসল্যান্ডের বিপক্ষে ৩–০ গোলের জয় দলটির আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে। এই ম্যাচগুলোতে স্কালোনি একাধিক পরীক্ষা–নিরীক্ষা করলেও আক্রমণ, বল দখল এবং সুযোগ তৈরিতে দল ছিল স্বচ্ছন্দ। তবে লাওতারো মার্তিনেজের ফিনিশিংয়ে কিছুটা ঘাটতি এখনও চিন্তার জায়গা।

সবচেয়ে বড় আলোচনায় আবারও লিওনেল মেসি। বয়স ৩৮ হলেও তিনি এখনো আর্জেন্টিনার হৃদয়। আইসল্যান্ডের বিপক্ষে বদলি নেমে মাত্র ১১৯ সেকেন্ডেই গোল করে তিনি আবারও নিজের জাদু দেখিয়েছেন। পেনাল্টি থেকে গোল হলেও পুরো আক্রমণ গড়ে উঠেছিল তাঁরই পায়ে। থিয়াগো আলমাদার গোলেও ছিল তাঁর অসাধারণ ভূমিকা। মেসি মাঠে নামলেই যেন পুরো ম্যাচের রঙ বদলে যায়—স্টেডিয়ামের বাতাসেও তখন ভিন্ন এক আবেগ ছড়িয়ে পড়ে।

তবে এই স্বপ্নযাত্রায় কিছু শঙ্কাও আছে আর্জেন্টিনার সামনে। দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের বয়স এবং অতিরিক্ত মেসি–নির্ভরতা বড় ম্যাচে চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপের দ্রুতগতির ও শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে এই দুর্বলতা সামনে আসার ঝুঁকি রয়েছে। তবুও আর্জেন্টিনা যদি নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে পারে, তাহলে আবারও ইতিহাস গড়ার ক্ষমতা তাদের আছে—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!