রক্তে ভেজা জার্সি, মাথায় গভীর চোট আর তীব্র যন্ত্রণা—কোনো কিছুই থামাতে পারেনি ইসমাইল সাইবারিকে। অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিকে ভয়াবহ সংঘর্ষে মাথা ফেটে গেলেও চিকিৎসা নিয়ে নতুন জার্সি পরে মাঠে ফেরেন মরক্কোর এই মিডফিল্ডার। এরপর টাইব্রেকারের শেষ শটে দুর্দান্ত গোল করে মরক্কোকে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেন তিনি। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই গ্যালারিতে ছুটে গিয়ে মায়ের বুকে জড়িয়ে ধরেন সাইবারি। আবেগঘন সেই মুহূর্তে আনন্দে ভেসে যায় পুরো মরক্কো শিবির।
বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার সকাল ৭টায় মেক্সিকোর মন্তেরেই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর এই রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে নেদারল্যান্ডসকে টাইব্রেকারে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ আটে জায়গা করে নেয় মরক্কো। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় ১-১ গোলে শেষ হওয়ার পর ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয় পেনাল্টি শুটআউটে।
আরও পড়ুনঃ কেপ ভার্দের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য একাদশে থাকছেন যারা
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দল জমিয়ে লড়াই করে। প্রথমার্ধে গোল না হলেও বল দখল ও আক্রমণে কিছুটা এগিয়ে ছিল মরক্কো। তারা চারটি শট নেয়, যার দুটি ছিল লক্ষ্যে। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডস তিনটি শট নিলেও কার্যকর কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেনি।
দ্বিতীয়ার্ধে ৭২তম মিনিটে কোডি গাকপোর গোলে এগিয়ে যায় নেদারল্যান্ডস। বক্সের ভেতর থেকে নেওয়া তার নিখুঁত শটে ডাচরা ১-০ ব্যবধানে লিড নেয়। সেই গোল ধরে রেখেই শেষ ষোলোর বাধা পেরোনোর স্বপ্ন দেখছিল তারা।
তবে নির্ধারিত সময়ের যোগ করা প্রথম মিনিটে (৯১ মিনিট) ম্যাচে দারুণভাবে ফিরে আসে মরক্কো। ইসা দিওপের অসাধারণ হেডে সমতায় ফেরে আফ্রিকার দলটি। বিশ্বকাপে মরক্কোর জার্সিতে এটিই ছিল তার প্রথম গোল। সেই গোলেই ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়েও দুই দল সর্বোচ্চ চেষ্টা চালায়। তবে আক্রমণে বেশি ধারালো ছিল মরক্কো। একপর্যায়ে সুফিয়ান রাহিমির শক্তিশালী শট দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন নেদারল্যান্ডসের গোলরক্ষক বার্ট ভারব্রুগেন। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত ৩০ মিনিটেও আর কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচের নিষ্পত্তি হয় টাইব্রেকারে।
পেনাল্টি শুটআটের শুরুতে এগিয়ে ছিল নেদারল্যান্ডস। প্রথম শটে টেউন কুপমেইনার্স গোল করলেও মরক্কোর হয়ে এল আয়নাউয়ি গোল করতে ব্যর্থ হন। এরপর দ্বিতীয় শটে জাস্টিন ক্লাইভার্টের শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। সুযোগ কাজে লাগিয়ে সুফিয়ান রাহিমি গোল করে সমতা ফেরান।
তৃতীয় শটে ওয়াউট ভেগহর্স্ট সফল হলেও মরক্কোর হয়ে শেমসদিন তালবিও জালে বল পাঠান। চতুর্থ শটে কুইন্টেন টিম্বারের শট পোস্টের বাইরে চলে যায়। তবে আশরাফ হাকিমিও সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি।
সবশেষ শটে নাটকের চূড়ান্ত দৃশ্য। নেদারল্যান্ডসের ক্রিসেনসিও সামারভিলের শট দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনো। এরপর জয়ের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে স্পটকিকে দাঁড়ান ইসমাইল সাইবারি। ঠান্ডা মাথায় বার্ট ভারব্রুগেনকে পরাস্ত করে বল জালে জড়িয়ে মরক্কোকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলে দেন তিনি।
এই জয়সূচক গোলের পেছনে ছিল আরেকটি অবিশ্বাস্য গল্প। অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিকে সংঘর্ষে মাথায় গুরুতর আঘাত পান সাইবারি। কপাল ফেটে রক্তে ভিজে যায় তার জার্সি। চিকিৎসা শেষে নতুন জার্সি পরে আবার মাঠে ফেরেন ২৫ বছর বয়সী এই ফুটবলার। শারীরিক যন্ত্রণা উপেক্ষা করে স্নায়ুচাপের সেই মুহূর্তে দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টিটি সফলভাবে রূপান্তর করেন তিনি।
আরও পড়ুনঃ ভূমিকম্পে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হারালেন আর্জেন্টাইন ফুটবলার
গোল করার পর আবেগ আর ধরে রাখতে পারেননি সাইবারি। জার্সি খুলে উচ্ছ্বাস প্রকাশের পর সরাসরি গ্যালারিতে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরেন। আনন্দে অশ্রুসজল চোখে ছেলেকে বুকে টেনে নেন তার মা। মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বকাপের অন্যতম আবেগঘন দৃশ্যে পরিণত হয়।
চলতি বিশ্বকাপে শুরু থেকেই দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন সাইবারি। গ্রুপ পর্বে ব্রাজিল, স্কটল্যান্ড ও হাইতির বিপক্ষে গোল করে এক আসরের বিশ্বকাপে কোনো মরক্কোর ফুটবলারের সর্বাধিক গোলের নতুন রেকর্ড গড়েন তিনি। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষেও নিজের অসাধারণ ধারাবাহিকতা ধরে রাখেন। বিবিসির রেটিংয়ে ৭.৩২ পয়েন্ট পেয়ে তিনি মরক্কোর তৃতীয় সর্বোচ্চ রেটিং পাওয়া ফুটবলার হন।
রুদ্ধশ্বাস এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত স্নায়ুচাপ সামলাতে ব্যর্থ হয় নেদারল্যান্ডস। অন্যদিকে শেষ মুহূর্তের সমতাসূচক গোল, গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনোর দুর্দান্ত সেভ এবং ইসমাইল সাইবারির জয়সূচক পেনাল্টিতে ইতিহাস গড়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয় মরক্কো। জার্মানির পর আরেক ইউরোপীয় শক্তিকে বিদায় করে আফ্রিকার প্রতিনিধিরা জানিয়ে দিল, এবারও তারা বিশ্বকাপে আরও বড় স্বপ্ন নিয়েই এগিয়ে চলেছে। আগামী শনিবার হিউস্টনে কোয়ার্টার ফাইনালে যৌথ আয়োজক কানাডার মুখোমুখি হবে অ্যাটলাস লায়ন্সরা।

