জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ হতে যাচ্ছে লিওনেল মেসির। তবে খেলোয়াড় হিসেবে বিদায় নিলেও ফুটবল থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন না আর্জেন্টাইন মহাতারকা। বরং অবসরের পর ক্লাব মালিকানা, তরুণ ফুটবলার তৈরি ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে আরও সক্রিয় হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। এরই মধ্যে স্পেনে দুটি ক্লাবের মালিকানায় যুক্ত হয়েছেন তিনি। ইন্টার মায়ামির সঙ্গেও অবসরের পর তাঁর মালিকানার সম্পর্ক তৈরি হওয়ার কথা রয়েছে।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচ আর কয়েক ঘণ্টা পর। বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে মাঠে নামবেন তিনি। এটি জাতীয় দলের হয়ে তাঁর ২০৮তম ম্যাচ। আর্জেন্টিনার হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ গোলের মালিক হিসেবেই জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ করবেন মেসি।
৩১ আগস্ট জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন মেসি। বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের ছয় সপ্তাহ পর আসে সেই ঘোষণা। জানিয়েছিলেন, জাতীয় দলকে দেওয়ার মতো তাঁর আর কিছু বাকি নেই। কোচ লিওনেল স্কালোনি অবশ্য মেসির জন্য দরজা খোলা রেখেছেন। তবে সবকিছু মিলিয়ে জাতীয় দলের অধ্যায় এবার সত্যিই শেষ হওয়ার পথে।
ক্লাব ফুটবলে অবশ্য এখনই থামছেন না ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা। ইন্টার মায়ামির সঙ্গে তাঁর চুক্তি ২০২৮ মৌসুম পর্যন্ত। চুক্তিটি প্রতি বছর পর্যালোচনা করা হয়। শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকলে মেয়াদ আরও বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। যত দিন খেলতে পারবেন, তত দিন মাঠে থাকার ইচ্ছা মেসির।
তবে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হওয়ার পর কোচ হওয়ার চেয়ে ক্লাব মালিক হওয়ার দিকেই তাঁর আগ্রহ বেশি। একসময় স্পোর্টিং ডিরেক্টর কিংবা ক্লাব সভাপতির উপদেষ্টা হওয়ার কথা ভেবেছিলেন তিনি। সম্প্রতি তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোচ নাকি ক্লাবের মালিক—কোন ভূমিকাটি বেছে নেবেন? মেসির উত্তর ছিল, মালিক।
কোচের দায়িত্বকে মেসির কাছে বেশি চাপের মনে হয়। প্রতি সপ্তাহের ম্যাচের ফল, প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত ও নানা ঝামেলা সামলাতে হয় কোচকে। অন্যদিকে মালিক হিসেবে তুলনামূলক দূরত্ব রেখে ক্লাবের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় যুক্ত থাকা যায়। তবে শুধু কোচ নিয়োগ দিয়ে দূরে থাকতে চান না মেসি। ক্লাবের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গেই যুক্ত থাকতে চান তিনি।
আরও পড়ুনঃ মেসির বিদায় অনুষ্ঠানসূচিতে থাকছে বিশেষ ‘চমক’
সেই পরিকল্পনার ভিত্তি এরই মধ্যে তৈরি করেছেন স্পেনে। চলতি বছরের এপ্রিলে বার্সেলোনার উপকণ্ঠের পঞ্চম স্তরের ক্লাব ইউই করনেল্লা কিনেছেন মেসি। তরুণ খেলোয়াড় গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ক্লাবটির গুরুত্ব রয়েছে। এটিকে তাঁর ভবিষ্যৎ ফুটবল প্রকল্পের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এরপর আরও বড় পদক্ষেপ নেন তিনি। ১ অক্টোবর স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগে খেলা সিডি এলদেনসে ঘোষণা করেছে, মেসি তাদের নতুন মালিক। তবে মালিকানা কার্যকর করতে স্প্যানিশ ক্রীড়া পরিষদ সিএসডির অনুমোদন প্রয়োজন। অনুমোদন মিললে এলদেনসেই হবে মেসির ফুটবল ব্যবসার প্রধান ক্লাব।
এলদেনসের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য অবনমন এড়ানো। সেই লক্ষ্যেই সাবেক ভিয়ারিয়াল কোচ হাভি কায়েহাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মেসি এখনো সরাসরি ক্লাবটির সবকিছু পরিচালনা করছেন না। তাঁর আস্থাভাজন কয়েকজন ব্যক্তি ক্লাবগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করছেন। ভবিষ্যতে সময় ও সুযোগ হলে নিজেই আরও সরাসরি যুক্ত হতে চান মেসি।
ক্লাবটির ম্যাচগুলোর ওপর অবশ্য নজর রাখছেন তিনি। রিয়াল ওভিয়েদোর বিপক্ষে এলদেনসে ৪-১ গোলে জেতার পর মালিক হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথম বার্তাও দিয়েছিলেন মেসি—‘আউপা দেপোর্তিভো।’
মেসির মালিকানায় আসার পর এলদেনসেকে ঘিরে বাণিজ্যিক আগ্রহও বেড়েছে। মালিকানা বদলের কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায় এক ডজন প্রতিষ্ঠান স্পনসর হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। তাদের কেউ আগে থেকেই মেসির সঙ্গে কাজ করে, আবার কেউ আগের মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করেও চুক্তিতে যেতে পারেনি।
উরুগুয়েতেও মেসির ফুটবল প্রকল্প রয়েছে। লুইস সুয়ারেজকে সঙ্গে নিয়ে ২০২৫ সালের মে মাসে তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেন দেপোর্তিভো এলএসএম। প্রথম মৌসুমেই দলটি উরুগুয়ের তৃতীয় বিভাগে ওঠার সাফল্য পায়।
মেসি ও সুয়ারেজের পরিকল্পনা ছিল আরও কয়েকটি ক্লাব নিয়ে একটি ফুটবল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। তবে বিভিন্ন বিভাগের ক্লাবকে ওপরে তুলতে বিপুল অর্থ প্রয়োজন হওয়ায় আপাতত সেই পরিকল্পনা থেমে আছে। এখন মেসির মূল লক্ষ্য এলদেনসেকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং সম্ভব হলে স্পেনের শীর্ষ লিগে নিয়ে যাওয়া।
ইন্টার মায়ামির সঙ্গেও অবসরের পর সম্পর্ক থাকবে মেসির। চুক্তির অংশ হিসেবে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করার পর মায়ামির ক্লাবের কিছু শেয়ারের মালিক হওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। তবে নিজের আলাদা কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি কেনার পরিকল্পনা নেই।
রোজারিওর শৈশবের ক্লাব নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে ফেরার সম্ভাবনাও অবশ্য রয়েছে আলোচনায়। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি। মেসির ঘনিষ্ঠদের মতে, তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কেন্দ্র এখন ইউরোপ ও মায়ামি।
তরুণ ফুটবলারদের নিয়েও আগ্রহ রয়েছে মেসির। ছেলের ম্যাচে নিয়মিত উপস্থিত থাকা এবং ‘মেসি কাপ’-এর সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততাই এর প্রমাণ। অনূর্ধ্ব-১৬ পর্যায়ের একাডেমিগুলোকে নিয়ে ২০২৫ সালে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্টের প্রথম আসরে অংশ নিয়েছিল আটটি দল।
আরও পড়ুনঃ মেসিকে বিশেষ উপহার দেবে সতীর্থরা
আয়োজকেরা ভেবেছিলেন, মেসি হয়তো কয়েকটি ম্যাচ দেখবেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে গত বছর টুর্নামেন্টের প্রতিটি দিনের প্রতিটি ম্যাচেই উপস্থিত ছিলেন তিনি। এবার মেসি কাপ আরও বড় হয়েছে। ২৫ অক্টোবর থেকে ইন্টার মায়ামির অনুশীলনকেন্দ্রে শুরু হবে এবারের আসর। অংশ নেবে ১৬টি একাডেমি। তালিকায় আছে আতলেতিকো মাদ্রিদ, চেলসি, বার্সেলোনা, ইন্টার মিলান, আর্সেনাল ও ইউই করনেল্লার মতো ক্লাব।
ফুটবলের বাইরেও মেসির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য বড় হয়েছে। ফোর্বসের হিসাবে, চলতি বছরের জুনে তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১১০ কোটি ডলার। গত এক বছরে ফুটবল ও ব্যবসা মিলিয়ে তাঁর আয় প্রায় ১৪ কোটি ডলার।
ব্যবসায় মেসির অন্যতম বড় অংশীদার অ্যাডিডাস। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আজীবনের চুক্তি করেন তিনি। হোটেল ব্যবসাতেও রয়েছে বড় বিনিয়োগ। মেলিয়ার সঙ্গে অংশীদারত্বে ‘মিম হোটেলস’ পরিচালনা করছেন তিনি। ইবিজা থেকে আন্দোরাসহ বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে ছয়টি বুটিক হোটেল।
নিজের শহর রোজারিওতেও বিনিয়োগ রয়েছে মেসির পরিবারের। পারানা নদীর পাশে ২৪টি বাড়ি নিয়ে ‘কারাস্কো এম’ নামের একটি আবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে তাঁদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া ‘এল ক্লাব দে লা মিলানেসা’ নামের রেস্তোরাঁ চেইনেরও অংশীদার মেসি। কাতালোনিয়ায় প্রতিষ্ঠানটির পাঁচটি শাখা খোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
পানীয়ের সামগ্রীর ব্যবসাতেও যুক্ত হয়েছেন মেসি। স্ট্যানলির সঙ্গে তাঁর রয়েছে বিশেষ মেটি সংগ্রহ। কোনো ক্রীড়াবিদের সঙ্গে স্ট্যানলির এটিই প্রথম বহু বছরের চুক্তি। পণ্যের উপকরণ ও রং নিয়েও মতামত দিয়েছেন মেসি।
মেসির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের শুরু অবশ্য তাঁর বাবা হোর্হে মেসিকে দিয়ে। গত আগস্টে ৬৮ বছর বয়সে মারা যান তিনি। শুরু থেকেই ছেলের ব্যবসায়িক বিষয়গুলো দেখাশোনা করতেন হোর্হে। পরে সেই ব্যবসা টেলিভিশন প্রযোজনা, বিপণন, গণমাধ্যম ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্বসহ বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়ে।
নিজের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত অবশ্য মেসি নিজেই নেন। তাঁর কাছে আসা প্রস্তাবগুলোও কঠোরভাবে যাচাই করা হয়। পছন্দ হলেই কেবল কোনো প্রকল্পে যুক্ত হন তিনি।
গত নভেম্বরে মায়ামিতে আমেরিকা বিজনেস ফোরামে নিজের ব্যবসা নিয়ে মেসি বলেছিলেন, ‘ব্যবসা এমন একটি বিষয়, যা আমাকে আগ্রহী করে। আমি আরও শিখতে চাই। কারণ আমি কিছুই জানি না। আমি মাত্র শুরু করেছি।’
জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ হচ্ছে, খেলোয়াড় মেসির ক্যারিয়ারও শেষের পথে। কিন্তু ফুটবলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হচ্ছে না। খেলোয়াড় হিসেবে বিদায়ের পর ক্লাব মালিক, ব্যবসায়ী ও তরুণ ফুটবলারদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নতুন ভূমিকায় দেখা যেতে পারে তাঁকে।
মাঠে মেসির রাজত্ব একদিন শেষ হবে। তবে অবসরের পরও ফুটবলেই থাকবেন তিনি—এবার খেলোয়াড় হিসেবে নয়, মালিক ও উদ্যোক্তা হিসেবে।

