অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজ জয়ের ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তিন ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে অস্ট্রেলিয়াকে ডিএলএস পদ্ধতিতে ৫ উইকেটে হারিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ নিজেদের করে নিয়েছে স্বাগতিকরা। যে দলের বিপক্ষে ২১ বছর ধরে কোনো ওয়ানডে জয় ছিল না বাংলাদেশের, সেই অস্ট্রেলিয়াকেই এবার টানা দুই ম্যাচে হারিয়ে নতুন অধ্যায় লিখেছে টাইগাররা।
২০২৭ বিশ্বকাপে সরাসরি জায়গা নিশ্চিত করার লড়াইয়ে থাকা বাংলাদেশ এ জয়ে টানা চারটি ওয়ানডে সিরিজ জয়ের কৃতিত্বও অর্জন করল। দেশের মাটিতে এটি তাদের টানা পঞ্চম সিরিজ জয়।
ম্যাচের শুরু থেকেই অস্ট্রেলিয়াকে চাপে ফেলে বাংলাদেশ। প্রথম ওভারেই তাসকিন আহমেদের দুর্দান্ত ডেলিভারিতে ফিরেন ম্যাথু শর্ট। পরের ওভারে মুস্তাফিজুর রহমানের শিকার হন কুপার কনোলি ও ম্যাট রেনশ। ফলে ওয়ানডে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শূন্য রানে ৩ উইকেট হারানোর লজ্জায় পড়ে অস্ট্রেলিয়া। একই সঙ্গে প্রথমবার কোনো দল হিসেবে অস্ট্রেলিয়াকে ০ রানে ৩ উইকেট হারানোর অবস্থায় ফেলতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ।
প্রথম ম্যাচে তাসকিনের প্রথম বলেই আউট হওয়া শর্ট এবারও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। তিন বল খেলে তাসকিনের ভেতরে ঢোকা বল ছেড়ে দিতে গিয়ে বোল্ড হন তিনি। এরপর মুস্তাফিজের প্রথম বলেই উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন কনোলি। একই ওভারের শেষ বলে কিপারের কাছেই ধরা পড়ে ফেরেন রেনশ।
দুই ওভার শেষে অস্ট্রেলিয়ার স্কোরবোর্ডে তখন ৩ উইকেটে কোনো রান নেই। দলের প্রথম রান আসে একটি নো বল থেকে।
আরও পড়ুনঃ বাবার পর এবার ছেলের সঙ্গে মাঠ কাঁপালেন মেসি, করলেন জার্সি বদল
ধাক্কা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও অষ্টম ওভারে অ্যালেক্স কেয়ারিকে ফিরিয়ে আরও বিপদে ফেলে দেন মুস্তাফিজ। ২৫ রানে ৪ উইকেট হারানো অস্ট্রেলিয়ার হয়ে এরপর প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন অধিনায়ক জশ ইংলিস ও ক্যামেরন গ্রিন।
নাহিদ রানাকে পরপর চার ও ছক্কা মারেন ইংলিস। পরে তানভির ইসলামকে ছক্কায় স্বাগত জানান গ্রিনও। তবে ৪৩ রানের জুটি ভেঙে দেন তানভির। ৩৪ রান করা ইংলিসকে ফেরানোর পর গ্রিনকেও ফিরতি ক্যাচে বিদায় করেন তিনি। গ্রিন করেন ২৫ রান।
৮১ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে তখন বিপর্যস্ত অস্ট্রেলিয়া। সেখান থেকে দলকে টেনে তোলেন মার্নাস লাবুশেন ও জেভিয়ার বার্টলেট। আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে মাত্র ৪৪ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন বার্টলেট। সপ্তম উইকেটে দুজন মিলে যোগ করেন ১০০ রানের জুটি, যা বাংলাদেশের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম শতরানের সপ্তম উইকেট জুটি।
তবে ফিফটির পর তাসকিনকে বড় শট খেলতে গিয়ে বোল্ড হন বার্টলেট। ৪৮ বলে ৫২ রান করেন তিনি। পরের বলেই অ্যাডাম জ্যাম্পাকে বোল্ড করে টানা দুই বলে দুই উইকেট তুলে নেন তাসকিন।
এর কিছু পরই বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ হয়ে যায়। তখন ৪২ ওভারে ৮ উইকেটে ১৮৭ রান সংগ্রহ করেছিল অস্ট্রেলিয়া। ৮৫ বলে ৫৫ রানে অপরাজিত ছিলেন লাবুশেন।
প্রায় ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট পর খেলা শুরু হলে ডিএলএস পদ্ধতিতে বাংলাদেশের লক্ষ্য নির্ধারিত হয় ৪১ ওভারে ১৯২ রান।
লক্ষ্য তাড়ায় নেমে বাংলাদেশও শুরুতে ধাক্কা খায়। প্রথম ওভারেই জেভিয়ার বার্টলেটের বলে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে আউট হন তানজিদ হাসান। একই ওভারে নাজমুল হোসেন শান্ত এলবিডব্লিউয়ের শিকার হলেও রিভিউ নিয়ে বেঁচে যান।
শুরুর সেই চাপ দ্রুত কাটিয়ে ওঠেন শান্ত ও সৌম্য সরকার। একাদশে ফিরে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেন সৌম্য। দুই ব্যাটসম্যানের ব্যাটে দ্রুত রান উঠতে থাকে। প্রথম ৬ ওভারের মধ্যেই আসে ৮টি চার ও একটি ছক্কা।
১৫ ওভারে বাংলাদেশের সংগ্রহ পৌঁছে যায় ৮৫ রানে। দুজনই ফিফটির পথে থাকলেও ৪২ রান করে বিদায় নেন। সৌম্য আউট হন ম্যাট রেনশের বলে, আর শান্ত রাইলি মেরেডিথের বলে ক্যাচ দেন উইকেটরক্ষকের হাতে।
লিটন দাস ২১ রান করে ফিরলেও তার ব্যাটিংয়ে ছিল ইতিবাচক ইঙ্গিত। এরপর মোসাদ্দেক হোসেন ১৫ রান করে আউট হলে কিছুটা চাপে পড়ে বাংলাদেশ। তখনও জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ৪৮ রান।
সেই অবস্থায় দায়িত্ব নেন তাওহিদ হৃদয় ও মেহেদী হাসান মিরাজ। দুজন ঠাণ্ডা মাথায় ব্যাট করে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন। এক পর্যায়ে ন্যাথান এলিসের শর্ট বলে হেলমেটে আঘাত পেয়ে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েন মিরাজ। তবে চিকিৎসা নিয়ে আবার ব্যাটিং চালিয়ে যান।
শেষ দিকে মেরেডিথকে ছক্কা ও চার মেরে সমীকরণ সহজ করে দেন হৃদয়। একই ওভারে মিরাজের ছক্কাতেই নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়।
৩৫ ওভারে ৫ উইকেটে ১৯৫ রান তুলে ৩৬ বল হাতে রেখেই জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। হৃদয় ৪০ ও মিরাজ ২২ রানে অপরাজিত থাকেন।
বল হাতে ৩ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হয়েছেন মুস্তাফিজুর রহমান। তাসকিন আহমেদও নিয়েছেন ৩ উইকেট। ব্যাট হাতে শান্ত করেন সর্বোচ্চ ৬৭ রান।
এই জয়ের মাধ্যমে শুধু সিরিজই নিশ্চিত করেনি বাংলাদেশ, বরং ওয়ানডে ক্রিকেটের সবচেয়ে সফল দল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নিজেদের সামর্থ্যেরও শক্ত বার্তা দিয়েছে। সিরিজের শেষ ম্যাচের আগেই ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে ইতিহাসের নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করল টাইগাররা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
অস্ট্রেলিয়া: ৪২ ওভারে ১৮৭/৮ (ইংলিস ৩৪, গ্রিন ২৫, লাবুশেন ৫৫*, বার্টলেট ৫২; তাসকিন ৩/৩৩, মুস্তাফিজ ৩/২৭, তানভির ২/৪৫)
বাংলাদেশ: ৩৫ ওভারে ১৯৫/৫ (শান্ত ৬৭, সৌম্য ৪২, লিটন ২১, হৃদয় ৪০*, মিরাজ ২২*)
ফল: ডিএলএস পদ্ধতিতে বাংলাদেশ ৫ উইকেটে জয়ী।
সিরিজ: তিন ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে।
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: মুস্তাফিজুর রহমান।

