যেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিএনপি

জিটি ডেস্ক

প্রকাশ:

৪৮ বছরে বিএনপি: প্রতিষ্ঠা থেকে বর্তমান নেতৃত্ব
৪৮ বছরে বিএনপি: প্রতিষ্ঠা থেকে বর্তমান নেতৃত্ব|ছবি: সংগৃহীত

১ সেপ্টেম্বর১ ৯৭৮ ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁয় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের দায়িত্ব থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসা এবং সেখান থেকে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা—জিয়াউর রহমানের এই রাজনৈতিক অভিযাত্রার পেছনে রয়েছে ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘটে যাওয়া নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

ক্ষমতার কেন্দ্রে জিয়াউর রহমান

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ওই বছরের ২৪ আগস্ট জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন।

আরও পড়ুন: নবম পে-স্কেলের অনুমোদন মন্ত্রিসভায়

৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর তিনি গৃহবন্দি হন। ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের পর তিনি পুনরায় সেনাপ্রধানের দায়িত্বে সক্রিয় হন। পরবর্তী সময়ে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি থাকাকালে জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালের ৮ নভেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের (সিএমএলএ) দায়িত্ব নেন।

এরপর ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিচারপতি সায়েম রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ালে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯ দফা কর্মসূচি ও রাজনৈতিক ভিত্তি

রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর জিয়াউর রহমান প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি ‘উন্নয়নের রাজনীতি’ ও ‘উৎপাদনের রাজনীতি’কে সামনে রেখে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

আরও পড়ুন: ঢাকার যানজট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর সাত নির্দেশনা

এই কর্মসূচিতে কৃষি ও উৎপাদন বৃদ্ধি, আত্মনির্ভরতা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ, প্রশাসনিক সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পায়। পরবর্তী সময়ে এই ১৯ দফাই জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

১৯৭৭ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার প্রতি জনসমর্থন যাচাইয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি ফলাফলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট তার পক্ষে পড়ে।

জাগদল থেকে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সাংগঠনিক রূপ দিতে ১৯৭৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় ‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’—জাগদল। দলটির আহ্বায়ক ছিলেন এএসএম সোলায়মান।

তবে জাগদলকে কেন্দ্র করে প্রত্যাশিত বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে না ওঠায় পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীকে নিয়ে ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ গঠিত হয়। ১৯৭৮ সালের ৩০ এপ্রিল জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং জিয়াউর রহমান এর চেয়ারম্যান হন।

আরও পড়ুন: নেপাল-চীন সীমান্তে বন্যা-ভূমিধসে নিখোঁজ ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি

এরপর ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন জিয়াউর রহমান।

যেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় বিএনপি

জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের অভিজ্ঞতার পর একটি একক ও সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নেন জিয়াউর রহমান। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মতের ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন দলের কাঠামো ও নাম নির্ধারণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়।

১৯৭৮ সালের ২৮ আগস্ট জাগদল বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এর কয়েক দিন পর ১ সেপ্টেম্বর রমনা রেস্তোরাঁয় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ বা বিএনপির নাম ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে দলের গঠনতন্ত্র ও কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়।

নতুন দলটিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দলের প্রথম মহাসচিবের দায়িত্ব পান ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী।

আরও পড়ুন: ছয় মাসে দেশে বিচারবহির্ভূত কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটেনি: সংসদীয় কমিটি

বিএনপির রাজনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়গুলো সামনে আনা হয়।

প্রতিষ্ঠার পর বিএনপির পথচলা

প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানের সময় জিয়াউর রহমান নিহত হন।

এরপর বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বিএনপি সরকার পরিচালনা অব্যাহত রাখে। ১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে বিএনপি ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।

আরও পড়ুন: যেভাবে ১৬৪৩ শিশুর প্রাণ বাঁচালেন নেপালের শিক্ষক

পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। এরপর ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং ২০০১ সালের নির্বাচনের পরও দলটি সরকার গঠন করে। তবে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ব্যাপকভাবে বর্জিত হওয়ায় ওই সংসদ অল্প সময়ের মধ্যেই বিলুপ্ত হয়।

দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে পরবর্তীতে পরিবর্তন আসে। বর্তমানে দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক রহমান।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। জাগদল ও জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের অভিজ্ঞতা পেরিয়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠা ছিল তৎকালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!