নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের কয়েক দিন পরও ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের সন্ধানে শনিবারও উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বুধবার হিমালয় অঞ্চলে আকস্মিক বন্যার স্রোতে পানি, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের ভয়াবহ ঢেউ গ্রামগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে যায়। এতে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটে।
শুক্রবার পর্যন্ত নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ২ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে। জরুরি উদ্ধারকারী দল এ পর্যন্ত ৫৮৬টি মরদেহ উদ্ধার করেছে। বন্যার স্রোতে ভেসে যাওয়া কয়েকজনের মরদেহ নেপাল থেকে অনেক দূরে ভারতের বিভিন্ন নদী থেকেও উদ্ধার করা হয়েছে।
বিপুলসংখ্যক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো প্রকল্প থাকা এই এলাকায় নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিখোঁজের তালিকায় নতুন করে ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎকর্মীর নাম যুক্ত করেছে। এর আগে তালিকায় ট্রেকার ও তিব্বতের কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাওয়া ব্যক্তিদের নামও ছিল।
আরও পড়ুন: মির্জা ফখরুলকে পুতিনের অভিনন্দন
দুর্যোগ থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, তারা প্রায় সবকিছু হারিয়েছেন। এখন নিখোঁজ স্বজনদের কী হয়েছে, সেই উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে তাদের। একই সঙ্গে নতুন করে জীবন শুরু করার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন তারা।
বন্যা থেকে বেঁচে যাওয়া বুদ্ধি রাম দাঙ্গোল এএফপিকে বলেন, ‘নদীর কাছের সব বসতি ভেসে গেছে। সেখানে এখন আর কিছুই নেই।’
নিখোঁজ ভাইয়ের সন্ধানে তিন দিন ধরে অপেক্ষা করছেন সামঝানা থিং। তিনি বলেন, ‘আমরা কিছুই জানি না। আশা করছি, সে নিরাপদ কোনো জায়গায় আছে।’
নতুন বন্যার শঙ্কা
রেড ক্রস জানিয়েছে, বুধবারের ভয়াবহ দুর্যোগে মানুষের ওপর ব্যাপক মানসিক ও শারীরিক আঘাত নেমে এসেছে। এতে প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন:সমঝোতার প্রস্তাবেও নিতাই রায়ের সঙ্গে বসতে নারাজ নয়ন
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো থেকে জীবিতদের উদ্ধারে উদ্ধারকারী দলগুলো কাজ করছে। তবে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে অনেক এলাকায় খাবার ও পানির সরবরাহ কমে আসছে।
নিখোঁজদের উদ্ধারে অভিযান চলার মধ্যেই নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রবল স্রোতে বরফ ও কাদা জমে বিভিন্ন স্থানে বিশাল জলাধারের মতো পানি জমেছে। এর মধ্যে একটি জলাধার উদ্ধারকর্মীদের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেপালের পুলিশ সব উদ্ধারকর্মীকে ‘অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছে। তিব্বত প্রান্তে আবারও একটি বাঁধ ভেঙে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলেও জানিয়েছে তারা।
তিব্বতে বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার সীমিত। সেখানে চীনা কর্তৃপক্ষই মূলত তথ্য সরবরাহ করছে। নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গিরং এলাকায় চীনের উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। পরে কর্তৃপক্ষ জানায়, পরিস্থিতির ঝুঁকি কিছুটা কমেছে।
আরও পড়ুন: সম্পূর্ণ বিনা খরচে মালয়েশিয়া নেবে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া শনিবার ভোরে জানিয়েছে, ওই এলাকায় দুই গ্রামবাসীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
সুড়ঙ্গে আটকা শ্রমিকদের উদ্ধারে অভিযান
নেপাল সীমান্তের দিকে ত্রিশূলী-৩ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গে কয়েকজন মানুষ আটকা পড়েছেন বলে শনাক্ত করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। তাদের উদ্ধারে সুড়ঙ্গে প্রবেশের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
নেপালি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত এএফপিকে বলেন, ‘দুটি হেলিকপ্টার পাঠানো হয়েছে। তবে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ সুড়ঙ্গের প্রবেশপথগুলোই ঠিকমতো শনাক্ত করা কঠিন।’
তিনি জানান, ওই এলাকা থেকে প্রায় ৩৫০ জন শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে একই এলাকায় আটকা পড়া আরও শতাধিক মানুষকে উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আরও পড়ুন: নেপালের বন্যায় মৃতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়াল, নিখোঁজ দেড় হাজার
ত্রিশূলী উপত্যকার অন্যান্য বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে উদ্ধার হওয়া শ্রমিকরা জানিয়েছেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
বুদ্ধ তামাং জানান, বন্যার সময় তিনি কর্মস্থলের একটি সুড়ঙ্গের ভেতরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় সেখানে আটকা থাকার পর বৃহস্পতিবার হেলিকপ্টারে করে তাকে উদ্ধার করা হয়। তিনি বলেন, ‘অন্য পাশে কাজ করা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সবাই ভেসে গেছেন।’
শুক্রবার নেপাল জানিয়েছে, দেশটিতে বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৭৯ জনে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন: একসঙ্গে নদীতে নেমেছিল ৫ শিশু, ফিরল নিথর দেহ হয়ে
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে ১ হাজার ৯২৪ জনের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। এর আগে নিখোঁজের সংখ্যা ছিল ৯৭৭।
অন্যদিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেপাল থেকে প্রবাহিত নদীগুলো থেকে তারা সাতটি মরদেহ উদ্ধার করেছে। এসব মরদেহ বন্যায় ভেসে যাওয়া ব্যক্তিদের বলে ধারণা করা হচ্ছে।

