চার দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় পেয়েছে মেক্সিকো। ইকুয়েডরকে ২-০ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে স্বাগতিকরা। তবে ঐতিহাসিক এই জয়ের আনন্দ মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হয়। মেক্সিকো সিটিতে হাজারো সমর্থকের উদযাপনের সময় হুড়োহুড়িতে দম বন্ধ হয়ে অন্তত দুজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।
সংবাদ সংস্থা এএফপি ও রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ইকুয়েডরের বিপক্ষে জয়ের পর মেক্সিকো সিটির বিখ্যাত ‘অ্যাঞ্জেল অব ইনডিপেনডেন্স’ স্মৃতিস্তম্ভসংলগ্ন হামবুর্গো ও ল্যাঙ্কাস্টার স্ট্রিটে হাজার হাজার সমর্থক উদযাপনে অংশ নেন। সেই সময় হুড়োহুড়ির মধ্যে ঘটে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনা।
আরও পড়ুনঃ নরওয়েকে কখনো হারাতে পারেনি ব্রাজিল, মুখ খুললেন হালান্ড
মেক্সিকো সিটির স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, ‘উন্নত চিকিৎসা ও কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস দেওয়ার পরও দুজনকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। দম বন্ধ হয়ে ৪৪ বছর বয়সী এক পুরুষ এবং ১৯ বছর বয়সী এক তরুণীর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি বলে দাবি করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদযাপনের হুড়োহুড়িতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। মেক্সিকো সিটির পাবলিক হেলথ সেক্রেটারিয়েটের বিবৃতির বরাতে তারা জানায়, শহরের কেন্দ্রস্থলের কাছে কোলোনিয়া জুয়ারেজ এলাকায় তিনজনকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। মৃতদের মধ্যে একজন ৪৪ বছর বয়সী পুরুষ এবং ১৯ ও ৪৮ বছর বয়সী দুজন নারী রয়েছেন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ম্যাচ শেষে সমর্থকদের ছোড়া আতশবাজির বিকট শব্দে হঠাৎ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সরু রাস্তায় একসঙ্গে দৌড়াতে গিয়ে প্রচণ্ড ভিড়ে অনেকেই একে অপরের ওপর পড়ে যান। এই হুড়োহুড়িতেই হতাহতের ঘটনা ঘটে।
মাঠের লড়াইয়ে অবশ্য শুরু থেকেই আধিপত্য দেখিয়েছে মেক্সিকো। আজতেকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত শেষ ৩২-এর ম্যাচে প্রথমার্ধেই দুটি গোল করে ইকুয়েডরের বিদায়ের ভিত গড়ে দেয় স্বাগতিকরা।
২২ মিনিটে বাঁ প্রান্ত দিয়ে আক্রমণে উঠে ডান পায়ের জোরালো শটে গোলের সূচনা করেন হুলিয়ান কিনিয়োনেস। এরপর ৩১ মিনিটে কিনিয়োনেসের ফিরতি পাস থেকে বক্সের ভেতর দারুণ ফিনিশিংয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার রাউল হিমিনেজ।
দ্বিতীয়ার্ধে বলের দখলে এগিয়ে ছিল ইকুয়েডর। ম্যাচে ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশ সময় বল ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। তবে সেই দখল কাজে লাগাতে পারেনি দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। তারা মাত্র পাঁচটি শট নিতে সক্ষম হয়, যার একটি ছিল লক্ষ্যে। অন্যদিকে মেক্সিকো ১৪টি শট নিয়ে তিনটি লক্ষ্যে রাখে এবং সেখান থেকেই দুটি গোল আদায় করে নেয়।
যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে ইকুয়েডরের হতাশা আরও বাড়ে। মেক্সিকোর এক খেলোয়াড়ের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের সময় মুখ ঢেকে কথা বলেন সেন্টারব্যাক পিয়েরো হেনকাপিয়ে। ভিএআরের হস্তক্ষেপে সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাঁকে।
বজ্রঝড়ের কারণে নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা পর শুরু হয়েছিল ম্যাচটি। তবে অপেক্ষার সেই সময়কে সার্থক করে দুর্দান্ত জয় তুলে নিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে মেক্সিকো। পরের ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ হবে ইংল্যান্ড অথবা ডিআর কঙ্গো।
এই জয় শুধু শেষ ষোলোর টিকিটই এনে দেয়নি, ভেঙেছে দীর্ঘ ৪০ বছরের নকআউট অভিশাপও। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে স্বাগতিক হিসেবে শেষবার নকআউট পর্বে জয় পেয়েছিল মেক্সিকো। সেবারও আজতেকা স্টেডিয়ামে বুলগেরিয়াকে একই ব্যবধানে ২-০ গোলে হারিয়ে শেষ আটে উঠেছিল দলটি। এরপর টানা চার দশক বিশ্বকাপের কোনো নকআউট ম্যাচ জিততে পারেনি মেক্সিকানরা।
আরও পড়ুনঃ তান্ত্রিকের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি প্রমাণ করে কেনের জোড়া গোলে কষ্টার্জিত জয়, শেষ ষোলোয় ইংল্যান্ড
এই জয়ে আজতেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপে টানা ১০ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ডও ধরে রেখেছে স্বাগতিকরা। এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনার সঙ্গে তিনটি ম্যাচই জেতা তিন দলের একটি ছিল মেক্সিকো। শুধু তাই নয়, গ্রুপ পর্বে তারা কোনো গোলও হজম করেনি। সেই দাপট নকআউট পর্বেও ধরে রাখল তারা।
ম্যাচটি আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনারও সাক্ষী হয়ে থাকে। ১৭ বছর বয়সী অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার গিলবার্তো মোরা শুরুর একাদশে সুযোগ পেয়ে ইতিহাস গড়েন। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে পেলের পর দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে শুরুর একাদশে খেলার কীর্তি গড়েন তিনি।
একদিকে ৪০ বছরের অপেক্ষা শেষে নকআউট জয়, অন্যদিকে সেই ঐতিহাসিক রাতেই প্রাণহানির শোক—সব মিলিয়ে মেক্সিকোর জন্য স্মরণীয় এই রাত হয়ে থাকল আনন্দ ও বেদনার এক বিরল মিশেল।

