২০২৬ বিশ্বকাপে অভিষেকেই ইতিহাস গড়ে শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে কেপ ভার্দে। স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের বিপক্ষে ড্র করে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়ায় দেশটির ফুটবলে এখন উৎসবের আবহ। তবে সেই আনন্দের মাঝেই বড় দুঃসংবাদ পেয়েছে দলটি। রাউন্ড অব ৩২-এ আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার আগে কেপ ভার্দের অধিনায়ক রায়ান মেন্ডেসের বিরুদ্ধে নিউজিল্যান্ডে এক ব্রাজিলীয় নারীর করা ধর্ষণের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে দেশটির পুলিশ।
ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম জিই জানিয়েছে, গত ২৭ মার্চ নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে ঘটনাটি ঘটে। সে সময় ফিফার আয়োজিত দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে কেপ ভার্দে জাতীয় দল সেখানে অবস্থান করছিল। অভিযোগ পাওয়ার পর ১০ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করে নিউজিল্যান্ড পুলিশ। তদন্তে অভিযোগের সঙ্গে আঘাতের ছবি, মেডিকেল রিপোর্ট এবং ফরেনসিক পরীক্ষার নথিও যুক্ত করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত রায়ান মেন্ডেসের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়নি এবং তদন্ত চলমান রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ বিশ্বকাপ থেকে বিদায়, সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের চার্টার্ড ফ্লাইট বাতিল
অভিযোগকারী ব্রাজিলীয় নারী বর্তমানে নিউজিল্যান্ডে বসবাস ও কর্মরত। প্রস্তুতি ম্যাচ চলাকালে নিউজিল্যান্ড ফুটবল ফেডারেশনের চুক্তির আওতায় তিনি কেপ ভার্দে দলের দোভাষী ও পরিচালন-সহায়কের দায়িত্ব পালন করছিলেন। দায়িত্ব পালনের কারণে তিনিও দলের সঙ্গে একই হোটেলে অবস্থান করছিলেন।
পুলিশের কাছে দেওয়া অভিযোগে ওই নারী বলেন, চিলির বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচের পর দলের জন্য সংরক্ষিত একটি কক্ষে বৈঠকের কথা বলে তাকে ডাকা হয়। সেখানে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন সেটি আসলে একটি সামাজিক আড্ডা। শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করায় কিছুক্ষণ পর তিনি নিজের কক্ষে ফিরে যান।
তার অভিযোগ, কিছু সময় পর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে তিনি কর্মসংক্রান্ত প্রয়োজন মনে করে দরজা খুলেছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তখন রায়ান মেন্ডেস তার কক্ষে প্রবেশ করেন এবং তাকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করে ধর্ষণ করেন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আত্মরক্ষার চেষ্টা করলে তার গলায় চাপ দেওয়া হয়, ঘুষি মারা হয় এবং কামড় দেওয়া হয়।
অভিযোগকারী জানান, ঘটনার পর তিনি নিজের মুখ, ঘাড়, শরীরের পাশ ও পায়ের আঘাতের ছবি তোলেন। পরে যৌন সহিংসতার শিকারদের সহায়তা দেওয়া একটি ক্লিনিকে চিকিৎসা নেন। মেডিকেল রিপোর্টে তার স্তন, ঘাড়, ঠোঁট, বাহু ও নিতম্বে একাধিক আঘাতের চিহ্নের পাশাপাশি যৌনাঙ্গেও আঘাতের উল্লেখ রয়েছে। এরপর তিনি পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন এবং ফরেনসিক পরীক্ষাও করান।
ওই নারী আরও দাবি করেছেন, তিনি কেপ ভার্দে ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো সহযোগিতা পাননি। পরে ১০ মে তিনি ও তার স্বামী প্রমাণসহ কেপ ভার্দে ফুটবল ফেডারেশন এবং ফিফার কাছে আইনি নোটিশ পাঠান। সেখানে বিশ্বকাপ থেকে রায়ান মেন্ডেসকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দেওয়ার আবেদনও করা হয়। ২০ মে ফিফার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অভিযোগ ফরমও পূরণ করা হয়। তবে তাদের দাবি, এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
নিউজিল্যান্ড পুলিশ তদন্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে দেশটির গোপনীয়তা আইনের কারণে অভিযুক্তের পরিচয় বা তদন্তের বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। পুলিশের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'নিউজিল্যান্ড পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, কেন্দ্রীয় অকল্যান্ড এলাকায় ১০ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে নথিভুক্ত একটি অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। এই মুহূর্তে আমরা এর বেশি কোনো তথ্য দিতে পারছি না।'
সংবাদমাধ্যমটির তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ ইতোমধ্যে হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। পাশাপাশি ফরেনসিক পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর অভিযোগ গঠন করা হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একজন ফৌজদারি আইনজীবীর মতে, পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
নিউজিল্যান্ড ফুটবল ফেডারেশন এ বিষয়ে জানিয়েছে, 'আমরা জানতে পেরেছি যে বিষয়টি নিউজিল্যান্ড পুলিশের কাছে রয়েছে, তাই এই পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করার জন্য তারাই অধিকতর উপযুক্ত অবস্থানে থাকবে।'
আরও পড়ুনঃ নকআউট পর্বের শুরুতে পর্তুগালের মুখোমুখি হবে ক্রোয়েশিয়া
অন্যদিকে ফিফা জানিয়েছে, তারা চলমান এই মামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবে না। কেপ ভার্দে ফুটবল ফেডারেশনও সংবাদ প্রকাশ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। রায়ান মেন্ডেসের প্রতিনিধির সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
৩৬ বছর বয়সী রায়ান মেন্ডেস বর্তমানে তুরস্কের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব ইগদির এফকের হয়ে খেলেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই তিনি প্রথম একাদশে ছিলেন। দলটি গ্রুপ ‘এইচ’-এর রানার্সআপ হয়ে শেষ ৩২-এ উঠেছে এবং আগামী ৩ জুলাই মায়ামিতে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার কথা রয়েছে।
নিউজিল্যান্ডের আইন অনুযায়ী, যৌন সহিংসতার মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। তবে এই মামলায় এখনো কোনো অভিযোগপত্র দাখিল হয়নি। তাই তদন্ত শেষ হওয়া এবং আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত রায়ান মেন্ডেসের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

