রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে ক্রিকেটে ভারত ও পাকিস্তান যেমন আইসিসি টুর্নামেন্ট ছাড়া খুব কমই একে অপরের মুখোমুখি হয়, তেমনি ফুটবলেও ইতিহাস, রাজনীতি ও দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের কারণে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের লড়াইও মূলত বিশ্বকাপের মঞ্চেই সীমাবদ্ধ। প্রায় ২১ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল। ফলে ফুটবলের অন্যতম ঐতিহাসিক এই দ্বৈরথ নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আগামী বুধবার রাতে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। দীর্ঘদিন পর দুই পরাশক্তির এই মুখোমুখি লড়াই ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে বাড়ছে উন্মাদনা।
আরও পড়ুনঃ সেমিফাইনালের খেলা কবে, কখন, কে কার মুখোমুখি
লিওনেল মেসির জাতীয় দলে অভিষেকের পর থেকে দুই দল মাত্র একবার মুখোমুখি হয়েছে। সেটি ছিল ২০০৫ সালের নভেম্বরে, আর সেটিই দুই দেশের ইতিহাসে একমাত্র প্রীতি ম্যাচ। আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের বাকি পাঁচটি সাক্ষাৎ হয়েছে বিশ্বকাপের মঞ্চে।
২০০৫ সালের আগস্টে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জিতে জাতীয় দলে ডাক পান মেসি। তবে জেনেভায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই প্রীতি ম্যাচে খেলতে পারেননি তিনি। কারণ, আন্তর্জাতিক অভিষেক ম্যাচে হাঙ্গেরির বিপক্ষে মাঠে নামার মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মাথায় লাল কার্ড দেখে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
বুদাপেস্টে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন মেসি। ভিলমোস ভানজাকের একটি ফাউলের প্রতিক্রিয়ায় কনুই দিয়ে আঘাত করলে রেফারি মার্কাস মার্ক তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান।
মেসিকে ছাড়াই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে রোমাঞ্চকর সেই প্রীতি ম্যাচে দুইবার এগিয়ে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মাইকেল ওয়েনের জোড়া গোলে সোভেন-গোরান এরিকসনের ইংল্যান্ড ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নেয়।
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ-দ্বৈরথের শুরু ১৯৬২ সালে। এরপর প্রতিটি ম্যাচই ছিল উত্তেজনা, বিতর্ক, নাটকীয়তা এবং আবেগে ভরপুর। তবে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু ফুটবলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে রয়েছে দুই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসও।
১৯৮০-এর দশকে ফকল্যান্ড যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের সম্পর্ক তীব্রভাবে অবনতি ঘটে। সেই যুদ্ধের প্রভাব আজও ফুটবল মাঠে অনুভূত হয়। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ও সমর্থকদের অনেকেই এখনো ফুটবলীয় আবেগের সঙ্গে সেই যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে আনেন।
অনেকের মতে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় আর্জেন্টিনার কাছে কেবল একটি ফুটবল ম্যাচে জেতা নয়, বরং জাতীয় মর্যাদা ও গৌরবের প্রতীক। আর এই কারণেই দুই দেশের প্রতিটি ম্যাচ অন্য মাত্রা পায়।
এই দ্বৈরথের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ। কোয়ার্টার ফাইনালে দিয়েগো ম্যারাডোনা প্রথমে হাত দিয়ে বিতর্কিত গোল করেন, যা পরে ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে যায়। একই ম্যাচে তিনি অসাধারণ একক নৈপুণ্যে করেন ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ হিসেবে স্বীকৃত সেই বিখ্যাত গোল।
এর ১২ বছর পর ১৯৯৮ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে আবার মুখোমুখি হয় দুই দল। দিয়েগো সিমিওনির সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় ইংল্যান্ডের ডেভিড বেকহাম লাল কার্ড দেখেন। ঘটনাটি সে সময় ইংলিশ গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও তীব্র করে তোলে।
আরও পড়ুনঃ ফাইনালে যাবে কে—ইংল্যান্ড নাকি আর্জেন্টিনা, জানাল সুপারকম্পিউটার
এরও আগে ১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ঘটে আরেকটি বিতর্কিত ঘটনা। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে লাল কার্ড দেখানো হলে তিনি মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। এতে মাঠে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের তৎকালীন কোচ আলফ রামসে নিজের খেলোয়াড়দের আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের সঙ্গে জার্সি বিনিময় করতে নিষেধ করেন। পাশাপাশি তিনি প্রকাশ্যে আর্জেন্টাইনদের ‘পশু’ বলে মন্তব্য করেন। আর্জেন্টিনায় এই মন্তব্যকে বর্ণবাদী ও চরম অপমানজনক হিসেবে দেখা হয়। সেই ঘটনার পর থেকেই দুই দেশের ফুটবল সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে এবং প্রীতি ম্যাচ আয়োজনও অনেকটাই কমে যায়।

