ভোজিনহার প্রাচীরে অবরুদ্ধ স্পেন, বিশ্বকাপে নবাগত কেপ ভার্দের রূপকথা

জিটি রিপোর্ট

প্রকাশ:

স্পেন দল
স্পেন দল |ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসে প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়েছে নবাগত কেপ ভার্দে। পুরো ম্যাচজুড়ে ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনের একচেটিয়া আধিপত্য, বল দখল এবং একের পর এক আক্রমণের পরও তারা গোল আদায় করতে পারেনি।

স্প্যানিশদের রুখে দিয়ে কেপ ভার্দের এই ঐতিহাসিক ও স্মরণীয় ফল অর্জনের মূল কারিগর ছিলেন তাদের ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা। প্রথমার্ধ থেকেই স্পেনের একের পর এক আক্রমণ বুক চিতিয়ে ঠেকিয়ে ম্যাচজুড়ে অপ্রতিরোধ্য দেয়াল হয়ে ছিলেন এই গোলকিপার।

ম্যাচের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে কেপ ভার্দের এই অর্জনকে আরও বেশি অবিশ্বাস্য ও বিস্ময়কর মনে হয়। পুরো ম্যাচে স্পেনের নিয়ন্ত্রণে ছিল ৭৪ শতাংশ বল, আর কেপ ভার্দের দখলে ছিল মাত্র ২৬ শতাংশ। স্প্যানিশরা যেখানে ৯২ শতাংশ সফলতায় ৭৬৪টি পাস খেলেছে, সেখানে কেপ ভার্দে মাত্র ৭৪ শতাংশ সফলতায় পাস দিতে পেরেছে ২৭৫টি। আক্রমণাত্মক ফুটবলেও দুই দলের ব্যবধান ছিল আকাশ-পাতাল।

আরও পড়ুনঃ ক্তিশালী স্পেনকে প্রথমার্ধে রুখে দিল নবাগত কেপ ভার্দে

স্পেন ম্যাচে মোট ২৩টি শট নেয়, যার মধ্যে ৮টিই ছিল লক্ষ্যবস্তুতে। বিপরীতে কেপ ভার্দে মাত্র ৬টি শট নিতে পেরেছে এবং গোলমুখে রাখতে পেরেছে মাত্র একটি। কর্নার আদায়ের ক্ষেত্রেও স্পেনের আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মতো, তারা ১১টি কর্নার পেলেও কেপ ভার্দে পেয়েছে মাত্র একটি।

পরিসংখ্যানের এত বড় ব্যবধানের পরও ম্যাচের স্কোরলাইন বদলাতে পারেনি স্পেন। কারণ কেপ ভার্দের রক্ষণভাগ এবং বিশেষ করে গোলরক্ষক ভোজিনহা এদিন মাঠে অতিমানবীয় পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন। প্রথমার্ধে যেভাবে তিনি স্পেনের একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়েছিলেন, দ্বিতীয়ার্ধেও সেই ধারাবাহিকতা পুরোপুরি বজায় রাখেন। স্পেনের নেওয়া ৮টি অন-টার্গেট শটের একটিও তিনি জালে ঢুকতে দেননি এবং এই অভিজ্ঞ গোলকিপারই ম্যাচের সবচেয়ে বড় পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন।

মূলত স্পেনের সমস্যাটা সুযোগ তৈরির অভাব ছিল না, বরং ছিল সুযোগ কাজে লাগাতে না পারা। মাঝমাঠে রদ্রি, পেদ্রি, গাভি ও ফাবিয়ান রুইজরা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে রেখেছিলেন। কিন্তু মাঠের শেষ প্রান্তে গিয়ে প্রয়োজনীয় ধার দেখাতে পারেননি ফেরান তোরেস ও মিকেল ওইয়ারসাবালরা। স্পেনের বেশ কয়েকটি পরিষ্কার সুযোগ নষ্ট হয়েছে এবং বাকি সুযোগগুলো ভোজিনহার অসাধারণ সব সেভের কাছে আটকে গেছে।

আরও পড়ুনঃ ঘানার ধর্মযাজকের দাবি, ‘রোনালদোকে বিশ্বকাপ জেতাতে গোপনে আঁতাত করছে ফিফা’

অন্যদিকে কেপ ভার্দের কৌশল ছিল অনেক বেশি বাস্তবমুখী। বিশ্বকাপ অভিষেকে তারা আক্রমণে বাড়তি ঝুঁকি না নিয়ে নিজেদের রক্ষণভাগকে সুসংগঠিত রাখার পথ বেছে নেয়। পুরো ম্যাচে মাত্র একটি শট লক্ষ্যে রাখতে পারলেও রক্ষণের শৃঙ্খলা, শারীরিক লড়াই এবং গোলরক্ষকের নৈপুণ্যে তারা কাঙ্ক্ষিত পয়েন্ট তুলে নেয়।

এই ম্যাচটির আরেকটি বিশেষ দিক ছিল কেপ ভার্দের অভিজ্ঞ একাদশ। ৩১ বছর ২৬ দিন গড় বয়স নিয়ে তারা চলতি বিশ্বকাপের সবচেয়ে বয়স্ক শুরুর একাদশ মাঠে নামিয়েছিল। আর সেই একাদশের সবচেয়ে প্রবীণ সদস্য ৪০ বছর বয়সী ভোজিনহা ম্যাচ শেষে হয়ে উঠেছেন কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম নায়ক। স্পেনের জন্য এই ফলাফল চরম হতাশাজনক হলেও কেপ ভার্দের জন্য এটি একটি মহাকাব্যিক জয়ের সমান।

পরিসংখ্যানের সব বিভাগে পিছিয়ে থেকেও তারা যে ১টি পয়েন্ট আদায় করেছে, তার কৃতিত্ব পুরোপুরি তাদের রক্ষণভাগ এবং গোলরক্ষক ভোজিনহার। বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথম ম্যাচেই স্পেনের মতো পরাশক্তিকে রুখে দিয়ে কেপ ভার্দে বিশ্বকে জানিয়ে দিল যে, তারা শুধু অংশ নিতে আসেনি বরং তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এসেছে। ম্যাচ শেষে পুরো ৯০ মিনিটের পরিসংখ্যান আসলে একটাই গল্প বলছে—বল ছিল স্পেনের, সুযোগ ছিল স্পেনের এবং নিয়ন্ত্রণও ছিল স্পেনের; কিন্তু দিনশেষে শেষ হাসি আর ফলাফল ছিল ভোজিনহা ও কেপ ভার্দের।

মন্তব্য (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!