উসমান দেম্বেলের দুর্দান্ত হ্যাটট্রিকে ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে নরওয়েকে উড়িয়ে দিয়েছে ফ্রান্স। বোস্টনে ইউরোপের দুই পরাশক্তির বহুল প্রতীক্ষিত লড়াইটি শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে দেম্বেলের একক নৈপুণ্যের মঞ্চে। মাত্র ৩২ মিনিটে হ্যাটট্রিক করে শুধু ম্যাচের ভাগ্যই গড়ে দেননি, বিশ্বকাপের ইতিহাসেও নিজের নাম লিখিয়েছেন নতুন করে। দীর্ঘ সময়ের গোলখরা ভেঙে ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকা বুঝিয়ে দিলেন, বড় মঞ্চে তিনিও ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে দেম্বেলের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল সর্বশেষ ব্যালন ডি’অরজয়ী হওয়া। কিন্তু টুর্নামেন্টের শুরুতে লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপে কিংবা আর্লিং হালান্ডের গোল উৎসবের মধ্যে অনেকটাই আড়ালে চলে গিয়েছিলেন তিনি। বড় টুর্নামেন্টে দেম্বেলের নিষ্প্রভ থাকার সমালোচনাও নতুন নয়।
গ্রুপ পর্বে ইরাকের বিপক্ষে ম্যাচের আগে বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে টানা ১৯ ম্যাচে কোনো গোল ছিল না দেম্বেলের। ইরাকের বিপক্ষে সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছিল একটি গোল দিয়ে। তবে সেটিই যে বড় বিস্ফোরণের পূর্বাভাস ছিল, তা খুব কম মানুষই অনুমান করতে পেরেছিলেন।
আরও পড়ুনঃ বিশ্বকাপে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে যে ১৯ দল
নরওয়ের বিপক্ষে শুরু থেকেই দুর্দান্ত ছন্দে ছিলেন ফরাসি এই ফরোয়ার্ড। প্রথম গোলটি আসে ম্যাচের সপ্তম মিনিটে। কিলিয়ান এমবাপের পাস থেকে বক্সের ভেতরে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে গোল করেন তিনি। ২০ মিনিটে আবারও এমবাপের পাস থেকেই ব্যবধান বাড়ান। এবার বাঁ দিক থেকে ভেতরে ঢুকে বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া বাঁকানো শটে পরাস্ত করেন নরওয়ের গোলরক্ষককে। ৩২ মিনিটে নিজের তৃতীয় গোলটি করেন ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে বক্সের ভেতর থেকে বাঁ পায়ের আরেকটি নিখুঁত ফিনিশিংয়ে।
দেম্বেলের এই অনবদ্য পারফরম্যান্স দেখে মুগ্ধ হয়েছেন ফ্রান্সের কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, 'গ্রেট খেলোয়াড়েরা মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকেন না, তাঁরা মুহূর্ত তৈরি করেন। ভালো খেলোয়াড় ও বিশ্বমানের খেলোয়াড়ে এটাই পার্থক্য।'
দেম্বেলের চলাফেরা, দৌড়, ড্রিবলিং ও আক্রমণে অংশ নেওয়ার ধরন পুরো ম্যাচজুড়েই ছিল চোখে পড়ার মতো। ডান প্রান্ত থেকে শুরু করে মাঝমাঠ, আবার বক্সের ভেতর—সব জায়গাতেই ছিল তার অবাধ বিচরণ। তার হিটম্যাপ যেন বিমূর্ত শিল্পী জ্যাকসন পোলকের কোনো শিল্পকর্মের মতোই বৈচিত্র্যময়। ধারাভাষ্যকারও দেম্বেলের পারফরম্যান্সকে আখ্যা দিয়েছেন 'লাইক আ মাস্টার আর্টওয়ার্ক।'
দেম্বেলের গোল করার ধরন অবশ্য নতুন নয়। বার্সেলোনা কিংবা পিএসজির জার্সিতে তিনি বহুবার একই ধরনের গোল করেছেন। তবে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে সেই পরিচিত দক্ষতাই নতুন করে সামনে এলো। ম্যাচটি এমবাপে ও হালান্ডের দ্বৈরথ হিসেবে প্রচার পেলেও শেষ পর্যন্ত আলো কেড়ে নেন দেম্বেলেই।
দেম্বেলের সবচেয়ে বড় শক্তি কোন পা—এ প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর অনেকেরই জানা নেই। এমনকি মজার ছলে অনেকে বলেন, তিনি নিজেও হয়তো জানেন না। তবে নরওয়ের বিপক্ষে তিনটি গোলই এসেছে তার বাঁ পা থেকে, যা আবারও প্রমাণ করেছে দুই পায়েই সমান দক্ষ এই ফরোয়ার্ড কতটা ভয়ংকর হতে পারেন।
এই হ্যাটট্রিক বিশ্বকাপের ইতিহাসেও বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। ম্যাচের শুরু থেকে হিসাব করলে মাত্র ৩২ মিনিটে হ্যাটট্রিক করে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্বিতীয় দ্রুততম হ্যাটট্রিকের রেকর্ড গড়েছেন। এর চেয়ে দ্রুত হ্যাটট্রিক করেছিলেন অস্ট্রিয়ার এরিক প্রবস্ট, যিনি ১৯৫৪ বিশ্বকাপে চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ২৪ মিনিটে তিন গোল করেছিলেন। ফলে গত ৭২ বছরের মধ্যে এটিই বিশ্বকাপের দ্রুততম হ্যাটট্রিক।
অবশ্য ম্যাচ শেষে ব্যক্তিগত রেকর্ড নিয়ে খুব একটা উচ্ছ্বসিত ছিলেন না দেম্বেলে। নিজের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, 'ভালো লাগছে। আমার জন্য বিশেষ মুহূর্ত। তবে ইরাক ও সেনেগালের বিপক্ষে নিজের পারফরম্যান্সই বেশি পছন্দ। আমার প্রভাব অনেক বেশি ছিল।'
আরও পড়ুনঃ নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ কেপ ভার্দে নাকি স্পেন, দেখুন সমীকরণ
তবে পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে রাশিয়ার ওলেগ সালেঙ্কোর পর বিশ্বকাপের প্রথমার্ধে এটিই প্রথম হ্যাটট্রিক। সেই ম্যাচে সালেঙ্কো ক্যামেরুনের বিপক্ষে পাঁচ গোল করেছিলেন, যার প্রথম তিনটিই এসেছিল প্রথমার্ধে। প্রায় তিন দশক পর দেম্বেলে সেই কীর্তির পুনরাবৃত্তি করলেন।
আরও একটি বিশেষ তালিকায় নাম লিখিয়েছেন তিনি। বিশ্বকাপে ব্যালন ডি’অরজয়ী হিসেবে হ্যাটট্রিক করা মাত্র চতুর্থ ফুটবলার এখন দেম্বেলে। তার আগে এই কীর্তি গড়েছিলেন ইউসেবিও (১৯৬৬), কার্ল-হেইঞ্জ রুমেনিগে (১৯৮২) এবং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (২০১৮)।
নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে দেম্বেলে শুধু একজন গোলদাতা হিসেবেই নিজেকে প্রমাণ করেননি। উইঙ্গার, স্ট্রাইকার এবং আক্রমণভাগের সৃজনশীল ফুটবলারের ভূমিকাও সমান দক্ষতায় পালন করেছেন। পুরো ম্যাচে তার বহুমুখী পারফরম্যান্সই ফ্রান্সের বড় শক্তি হয়ে উঠেছিল।
এই পারফরম্যান্সে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত ছিলেন কিলিয়ান এমবাপে। সতীর্থের প্রতিটি গোলের পর উচ্ছ্বাসে ভাসতে দেখা গেছে তাকে। হ্যাটট্রিক পূর্ণ হওয়ার পর দেম্বেলেকে দুইবার কোলে তুলে উদ্যাপনও করেন ফরাসি অধিনায়ক।
দেম্বেলের এই দুর্দান্ত ফর্ম ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ প্রতিপক্ষদের জন্য নিঃসন্দেহে বড় সতর্কবার্তা। এমবাপে ও দেম্বেলের সমান চারটি করে গোল এখন ফ্রান্সের আক্রমণভাগকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে।
এ কারণেই থিয়েরি অঁরি ম্যাচ শেষে আরও বলেন, 'পরের ম্যাচে যদি ডিফেন্ডার হিসেবে আমাকে দেম্বেলের মুখোমুখি হতে হতো, তাহলে খুব দুশ্চিন্তায় ভুগতাম।'
নরওয়ের বিপক্ষে দেম্বেলের এই অসাধারণ পারফরম্যান্স প্রমাণ করে দিয়েছে, বড় মঞ্চে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার সামর্থ্য তারও এমবাপের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

