অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের টেস্ট সেঞ্চুরি ছিল না। দীর্ঘ সেই অপেক্ষার অবসান ঘটালেন তানজিদ হাসান তামিম। ডারউইন টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণ সামলে ১৯০ বলে ১০১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সেঞ্চুরির ইতিহাস গড়েছেন ২৫ বছর বয়সী এই বাঁহাতি ওপেনার।
তানজিদের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরির সঙ্গে নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪, মুমিনুল হকের ৪৯ ও মুশফিকুর রহিমের ৩৬ রানের কার্যকর ইনিংসে দ্বিতীয় দিন শেষে শক্ত অবস্থানে বাংলাদেশ। ৬ উইকেটে ৩৫১ রান তুলে অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ১৫৩ রানে এগিয়ে আছে সফরকারীরা। মেহেদী হাসান মিরাজ ৩২ ও হাসান মাহমুদ ১৩ রানে অপরাজিত আছেন।
নিজের দ্বিতীয় টেস্টেই ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি পেলেন তানজিদ। মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজলউড, প্যাট কামিন্স ও নাথান লায়নের মতো বোলারদের সামনে আটটি চার ও একটি ছক্কায় সাজিয়েছেন ১০১ রানের ইনিংস। শেষ পর্যন্ত লায়নের ঘূর্ণিতে থামে তার ঐতিহাসিক ইনিংস।
আরও পড়ুনঃ ডারউইন টেস্টে প্রথম দিন শেষে চালকের আসনে বাংলাদেশ
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের এর আগে টেস্ট সেঞ্চুরি ছিল না। ২০০৩ সালে সিডনিতে স্টুয়ার্ট কার্লাইল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জিম্বাবুয়ের প্রথম ব্যাটার হিসেবে সেখানে সেঞ্চুরি করেছিলেন। এরপর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের বিপক্ষে নতুন কোনো দেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে নাম লেখালেন তানজিদ।
একই বছর, ২০০৩ সালে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়া সফরে টেস্ট খেলেছিল বাংলাদেশ। ডারউইনে সেই সফরে ভরাডুবির পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আরেকটি টেস্ট সিরিজ খেলতে বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ২৩ বছর। সেই দীর্ঘ বিরতির পর ফিরে এসে তানজিদের সেঞ্চুরি বাংলাদেশের বদলে যাওয়ার ছবিটাই যেন তুলে ধরল।
দিনের শুরুতে তানজিদের সঙ্গে জুটি গড়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেন মুমিনুল। দারুণ ছন্দে ব্যাট করেও অল্পের জন্য ফিফটি পাননি তিনি। ৪৯ রান করে হ্যাজলউডের বলে আউট হন মুমিনুল। তানজিদ-মুমিনুলের জুটিতে আসে ১০২ রান, যা ভাঙে ১৮৯ বলে।
মুমিনুলের বিদায়ের পর অধিনায়ক শান্তকে সঙ্গে নিয়ে আবারও ইনিংস গুছিয়ে নেন তানজিদ। তৃতীয় উইকেটে দুজন যোগ করেন ৯৩ রান। ১৫৭ বলের এই জুটিই বাংলাদেশকে অস্ট্রেলিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর ভিত গড়ে দেয়।
তানজিদ ফেরার পর মুশফিককে সঙ্গে নিয়ে আরও ৬৬ রান যোগ করেন শান্ত। থিতু হয়েও ইনিংস বড় করতে পারেননি মুশফিক, ফিরেছেন ৩৬ রানে। তবে সবচেয়ে বেশি আক্ষেপে পুড়েছেন শান্ত। ‘কুল এন্ড কন্ট্রোলড’ ব্যাটিংয়ে সেঞ্চুরির দিকে এগোতে থাকা বাংলাদেশ অধিনায়ক ১২৬ বলে ৮৪ রান করে থামেন।
চোট কাটিয়ে একাদশে ফেরা লিটন দাস অবশ্য স্বস্তিটা দীর্ঘ করতে পারেননি। স্টার্কের বলে রানের খাতা খোলার আগেই ফেরেন এই উইকেটরক্ষক-ব্যাটার। মাত্র ১১ রানের ব্যবধানে লিটন, শান্ত ও মুশফিককে হারিয়ে ৬ উইকেটে ৩০৮ রানে নেমে যায় বাংলাদেশ। তখন অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচে ফেরার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল।
সেই চাপ সামলে সপ্তম উইকেটে দলকে আবারও পথ দেখান মিরাজ ও হাসান মাহমুদ। দুজনের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে এসেছে ৪৩ রান, যার জন্য তারা খেলেছেন ১৪৭ বল। মিরাজ ৭৩ বলে ৩২ এবং হাসান ৭৬ বলে ১৩ রানে অপরাজিত। টেস্টে এক ইনিংসে বল মোকাবিলার হিসাবে এটিই হাসানের সর্বোচ্চ।
আরও পড়ুনঃ প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পাঁচ উইকেট পেলেন হাসান মাহমুদ
হঠাৎ ধসের পর তাইজুল ইসলাম কিংবা তাসকিন আহমেদকে না পাঠিয়ে হাসানকে ব্যাটিংয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্তও কাজে দিয়েছে বাংলাদেশের। কাউন্টি ক্রিকেটে বাউন্সি ও দ্রুতগতির উইকেটে খেলার অভিজ্ঞতা তার ব্যাটিংয়ে কাজে লাগতে দেখা গেছে।
দিনভর বাংলাদেশের ব্যাটারদের থামাতে অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়েছে। স্টার্ক ও হ্যাজলউড নিয়েছেন দুটি করে উইকেট। লায়ন ও অধিনায়ক কামিন্স পেয়েছেন একটি করে উইকেট।
১৫৩ রানের লিড নিয়ে তৃতীয় দিনের ব্যাটিং শুরু করবে বাংলাদেশ। পরিসংখ্যানও এখন পর্যন্ত সফরকারীদের পক্ষেই। অস্ট্রেলিয়া নিজেদের প্রথম ইনিংসে ১০০ বা তার বেশি রানে পিছিয়ে পড়েও সর্বশেষ টেস্ট জিতেছিল ২০১০ সালে সিডনিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে। এরপর বাংলাদেশের বিপক্ষে এই ম্যাচের আগে এমন পরিস্থিতিতে পড়া ২৮ টেস্টের ২২টিতেই হেরেছে তারা, বাকি ম্যাচগুলো হয়েছে ড্র।
ডারউইনের মারারা ক্রিকেট গ্রাউন্ডে তৃতীয় ইনিংসের গড় স্কোর ১৮৯। ফলে দ্বিতীয় দিন শেষে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই বাংলাদেশের হাতে। তৃতীয় দিনের প্রথম সেশনে মিরাজ-হাসানরা লিড আরও বাড়াতে পারলে অস্ট্রেলিয়ার সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার সুযোগ থাকবে সফরকারীদের।

